বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিহত সেনাসদস্য রিফায়াতের গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া, চলছে দাফনের প্রস্তুতি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

নিহত সেনাসদস্য রিফায়াতের গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া, চলছে দাফনের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সংঘটিত এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ সদস্য তাসনিম রিফায়াত।

 

নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর দুঃসংবাদ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রাজশাহীতে তার পৈতৃক নিবাসে পৌঁছানোর পরপরই সেখানে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

দেশের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত একজন তরতাজা তরুণের এমন অকাল প্রয়াণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং এলাকাবাসী। দেশের নিরাপত্তায় নিবেদিত সামরিক বাহিনীর একজন দক্ষ সদস্যের এমন অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

 

দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ এবং কান্নার রোলে বিন্দারামপুর গ্রামের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। থেমে থেমে ভেসে আসা শোকসন্তপ্ত মানুষদের কান্নার আওয়াজ চারপাশের পরিবেশকে করে তুলেছে চরম বিষাদময় ও নিস্তব্ধ।

 

নিহত সেনাসদস্য তাসনিম রিফায়াতের পৈতৃক নিবাস রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার অন্তর্গত দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা আসাদুল ইসলামের সন্তান। পারিবারিক কাঠামোতে তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তাসনিম রিফায়াত ছিলেন মেজ।

 

শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত ও দায়িত্বশীল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন তিনি। শোকাহত স্বজনরা তার অতীত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, শিক্ষাজীবনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি রাজশাহী সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন।

 

সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই নিজের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের অসামান্য সুযোগ পান দেশপ্রেমিক এই তরুণ। এরপর দীর্ঘ প্রায় দশ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষায় সামরিক বাহিনীতে নিজের পবিত্র দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

 

তার এই বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের আকস্মিক সমাপ্তি স্থানীয়দের কাছে এক বিশাল ধাক্কা হয়ে এসেছে। পারিবারিক জীবনের এক আনন্দময় অধ্যায়ে রিফায়াতের আড়াই বছর বয়সী একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান রয়েছে, যার নাম রাফতা তাসলিম ইকরা। বাবার আকস্মিক চিরবিদায়ের বিষয়টি অনুধাবন করার মতো মানসিক পরিপক্বতা বা বয়স এখনো এই অবুঝ শিশুটির হয়নি।

 

মা ও স্বজনদের কান্নার মাঝে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা এই শিশুটিকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের আহাজারি উপস্থিত সকলের চোখেই শোকের জল এনে দিয়েছে। হঠাৎ করে পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ও বয়োজ্যেষ্ঠদের আদরের সন্তানকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে হারিয়ে স্বজনরা যেন সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাটুকুও সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছেন।

 

একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিগত দিনের নানা স্মৃতি রোমন্থন করে তারা কেবলই অঝোরে কাঁদছেন এবং মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছেন। ছেলের এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুতে শোকে যেন আক্ষরিক অর্থেই পাথর ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন বাবা আসাদুল ইসলাম।

 

উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি শুধু অস্পষ্ট ও ভগ্ন কণ্ঠে বলেন, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রিফায়াত ছিলেন মেজ। জাগতিক এই পৃথিবী থেকে তার এখন আর কিছুই চাওয়ার নেই, তিনি শুধু তার মৃত ছেলের পবিত্র আত্মার শান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে বিনীতভাবে দোয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

 

প্রিয় সন্তানের নিথর দেহ দেখার অপেক্ষায় থাকা একজন অসহায় পিতার এই বুকফাটা আর্তনাদ উপস্থিত পরিবেশকে আরও অনেক বেশি বেদনাবিধুর করে তোলে। অন্যদিকে, প্রিয় ভাইকে হারানোর তীব্র বেদনায় কাতর হয়ে নিহত সেনাসদস্য তাসনিম রিফায়াতের ভাই দীপ্ত গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে কথা বলেছেন।

 

তিনি জানান, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব আনুষ্ঠানিকতা ও সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তার ভাইয়ের মরদেহ রাজশাহীর বিন্দারামপুর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহ এসে পৌঁছাতে বৃহস্পতিবার দুপুর গড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।

 

একইসঙ্গে তিনি তার ভাইয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্ট সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

ইতোমধ্যেই বিন্দারামপুর গ্রামের স্থানীয় সামাজিক গোরস্থানে দেশের এই কৃতী সন্তানকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার জন্য কবর খননসহ আনুষঙ্গিক সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজনরা অত্যন্ত শোকাহত হৃদয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য।

 

একজন সেনাসদস্য হিসেবে দেশের প্রতি তার যে অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগ ছিল, তা এলাকার তরুণ প্রজন্মের কাছে সবসময় অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। সামরিক বাহিনীর নিজস্ব প্রটোকল এবং ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে তার দাফনকার্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই একযোগে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শোকের এই চরম কঠিন সময়ে পুরো বিন্দারামপুর গ্রাম যেন একটি শোকার্ত পরিবারে পরিণত হয়েছে।