পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন এসব কথা বলেন।
দেশের এভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে পরিচালন ব্যয় হ্রাস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি এবং যুগোপযোগী নীতিগত সংস্কারের ওপর তিনি বিশেষভাবে জোর দেন। সম্মেলনে আবদুল্লাহ আল মামুন দেশের বহুল আলোচিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে হতাশা ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশীয় এয়ারলাইন অপারেটরদের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ করা হয়নি। অথচ একটি টার্মিনাল মূলত এয়ারলাইন অপারেটর এবং সাধারণ যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করেই নির্মিত হওয়া উচিত।
এভিয়েশন হাব হিসেবে সিঙ্গাপুরের সফলতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ এলাকা প্রায় একশো বিঘা এবং সেখানে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত কেনাকাটা ও বিশ্বমানের বিনোদনমূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ড ও যাত্রীবান্ধব বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকলে শুধু বিশাল টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করে এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
এভিয়েশন খাতের নীতিগত সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পুরনো ১৯৮৪ সালের বিধিমালার পরিবর্তে বর্তমানে যে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কার্যকর হলে এই খাতে একটি ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
আন্তর্জাতিক মান ও নিয়মাবলি অনুসরণ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নীতিগত কাঠামো আরও বেশি ব্যবসাবান্ধব ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি। দেশের একমাত্র আইএটিএ সদস্য এয়ারলাইন হিসেবে ইউএস-বাংলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন নীতিমালার ফলে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা দেশীয় সংস্থাগুলোর বিশাল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করবে।
বিমানবন্দরে রানওয়ে সংকটের কারণে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি বাস্তব চিত্রও তিনি তুলে ধরেন। একটি রানওয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে উড়োজাহাজগুলোকে উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ থাকতে হয়।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে একটি বোয়িং উড়োজাহাজের প্রায় তিনশো কেজি এবং এয়ারবাসের ক্ষেত্রে প্রায় নয়শো কেজি অতিরিক্ত জ্বালানি অযথাই পুড়ে যায়। এমনকি ছোট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেও প্রায় পঁচিশ মিনিটের ফ্লাইটের সমপরিমাণ জ্বালানি অপচয় হয়।
এই রানওয়ে সংকটের কারণে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ টাকার বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন, যা একইসঙ্গে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং ফ্লাইট সূচি বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে।
বাংলাদেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হলে এই খাতে প্রতিযোগিতার বিকল্প নেই। ঢাকা-কলকাতা বা কুয়ালালামপুরের মতো বিমানবন্দরে যেখানে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, সেখানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অজুহাতে অন্যদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর গেলে একটি বোয়িং উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রায় সাতানব্বই হাজার টাকা খরচ হয়, অথচ বিদেশি এয়ারলাইনগুলোকে বাংলাদেশে এই সেবার জন্য প্রায় দুই লাখ পঁচিশ হাজার টাকা গুনতে হয়।
আন্তর্জাতিক মানের সনদ থাকার পরও লাইসেন্স না পাওয়ায় ইউএস-বাংলা এই সেবা প্রদানে যুক্ত হতে পারছে না বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। অতিরিক্ত সরকারি কর এবং শুল্কের কারণে বিমানভাড়া আকাশচুম্বী হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর বা সিঙ্গাপুরগামী যাত্রীদের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হয়।
অভ্যন্তরীণ রুটেও উচ্চমাত্রার কর, অতিরিক্ত জ্বালানি মূল্য এবং টিকিট বিক্রির কমিশনের কারণে এয়ারলাইনগুলোর ব্যয়ভার বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের পর্যটন ও কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতে। তিনি জানান, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও মাত্রাতিরিক্ত কার্গো চার্জ একটি বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে, বিমান কেনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় লিজিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান, ইউএস-বাংলা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা মূলত প্রস্তুতকারী ও লিজিং কোম্পানির অর্থায়নে পরিচালিত হবে।
বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। এছাড়া এভিয়েশন খাতের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনেরা এই সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।