শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে, রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেওয়া এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি দেশের সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের বিপুল জনশক্তির পরিসংখ্যান তুলে ধরে জাতীয় সংকটে সম্মিলিত ঐক্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন।
জনগণের প্রতি সরাসরি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, দেশ পুনর্গঠনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তিনি দেশবাসীর কাছে একটি বিশেষ সাহায্য প্রত্যাশা করছেন। পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে সারা দেশে বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য সংখ্যা প্রায় তেইশ লাখ।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন প্রায় বাইশ হাজার সদস্য। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর বিশাল সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এই বিপুল সংখ্যক জনশক্তি যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশকে পুনর্গঠনের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তবে কোনো বাধাই তাদের এই মহান উদ্দেশ্যকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।
তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান, কারণ এই ভূখণ্ড আমাদের সবার এবং এখানেই আমাদের আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও নিরাপদ জীবন উপহার দিতে হবে।
তরুণ সমাজের অভাবনীয় ও অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের এই বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী যদি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা যে শতভাগ সম্ভব, তার অকাট্য প্রমাণ তারা ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন। তাঁর মতে, ওই উত্তাল সময়ে তরুণ সমাজ গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা চাইলে অসাধ্য সাধন করতে পারে।
পরিবর্তনের সেই ঐতিহাসিক সূচনা যেহেতু দেশের তরুণদের হাত ধরেই শুরু হয়েছে, তাই রাষ্ট্র বিনির্মাণের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপেও তাদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। এই ধারাবাহিকতায় তিনি আগামী তিন মাসের জন্য একটি নিবিড় ও দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উল্লেখ করেন যে, এই স্বল্প সময়ে হয়তো ডেঙ্গু সমস্যার শতভাগ সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব নাও হতে পারে, তবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্তত আশি ভাগ সফলতা অর্জন করা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব হবে।
ডেঙ্গু বিস্তারের বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক কারণগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যত্রতত্র পড়ে থাকা ভাঙাচোরা জিনিসপত্র এবং মাটির পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই প্রাণঘাতী এডিস মশার জন্ম হয়।
দেশের প্রতিটি মানুষ যদি সামান্য সচেতনতা অবলম্বন করে এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখে, তবে স্বাস্থ্য খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। অনুষ্ঠানে সশরীরে এবং অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত থাকা লাখো জনতার উদ্দেশে তিনি নাগরিক সচেতনতার একটি অত্যন্ত গভীর উদাহরণের অবতারণা করেন।
তিনি বলেন, মাঠে উপস্থিত কেউ যদি ব্যবহৃত টিস্যু বা পানির খালি বোতল যত্রতত্র ফেলে দেয়, হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কেউ তাকে বাধা দেবে না বা কিছু বলবে না। কিন্তু একজন বিবেকবান নাগরিক হিসেবে এই অপরিচ্ছন্ন দৃশ্য দেখতে কখনোই ভালো লাগার কথা নয়।
যখন এই ছোট ছোট ময়লাগুলো এক জায়গায় জমে বড় আকার ধারণ করবে, তখন সেখান থেকেই মারাত্মক সব রোগজীবাণুর সৃষ্টি হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। নাগরিকদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন যে ময়লার স্তূপ থেকে দূরে থাকলে তারা নিরাপদ থাকবেন এবং এতে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
কিন্তু এই অবহেলার কারণে সৃষ্ট রোগজীবাণু একসময় নিজের আপনজন বা প্রিয়জনকেই ভয়াবহ অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই নিজেকে, নিজের পরিবারকে, সমাজকে এবং সর্বোপরি গোটা দেশকে সুস্থ রাখতে হবে।
এই মহৎ কাজটি যে খুব একটা কঠিন নয়, তা বোঝাতে তিনি একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন হয়তো পরিচ্ছন্নতার এই কাজের জন্য সময় বের করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে প্রতি সপ্তাহে যদি মাত্র এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থল পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দেশব্যাপী একটি দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সক্ষম হবে।
সবশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান যেন তারা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে নিজেরা বিরত থাকেন এবং অন্যকেও এই বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের তরুণ সমাজ যেভাবে দেশকে পরিবর্তনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, সেই একই দেশপ্রেম ও উদ্দীপনা নিয়ে এবার রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনে তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এই বলিষ্ঠ আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত দেশে এক নতুন জাতীয় জাগরণের সূচনা করার সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।