মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞাত ছিল এবং সংবাদমাধ্যম থেকেই প্রশাসন প্রথম এই বিষয়টি অবগত হয়।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা স্বীকার করলেও মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, বাজেট বরাদ্দ এবং আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক রীতির ব্যত্যয় ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সচিবালয়ে আয়োজিত এই প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক পত্রবিনিময় অথবা দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ ছাড়াই কমিশন এই সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করেছে।
তিনি জানান, সাধারণ নাগরিকদের মতো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনের বহুস্তরীয় দিনক্ষণ জানতে পেরেছেন।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করেন যে, এই ঘোষণার পেছনে সরকারের কোনো প্রকার সম্মতি, আলোচনা কিংবা পূর্বপ্রস্তুতির সংযোগ ছিল না। নির্বাচন কমিশনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক এক্তিয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মীর শাহে আলম মন্তব্য করেন, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্ণ আইনি অধিকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে।
তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাস ও বিদ্যমান প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে এমন ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনার আগে সরকারের নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় সভা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি বৈঠক এবং অর্থ বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চূড়ান্ত করার একটি ধারাবাহিক ঐতিহ্য রয়েছে।
প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত না করে এককভাবে তারিখ নির্ধারণ কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করতে চায় না, তবে যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ সফল করতে প্রাতিষ্ঠানিক আন্তঃযোগাযোগ অপরিহার্য।
তিনি পুনরায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সম্ভাব্য দিনক্ষণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো স্তরেই প্রাথমিক কিংবা বিস্তারিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নীতিগত ও বাস্তবায়নযোগ্যতার দিক থেকে এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নির্বাহী বিভাগ সম্পূর্ণভাবে অনবহিত রয়েছে।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সারা দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, মোট সাতটি ভিন্ন ধাপে এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ আগামী ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপের নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে আয়োজনের কথা বলা হয়।
অবশিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জন্য আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি চতুর্থ ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম ধাপ, ২২ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপ এবং সর্বশেষ ২৭ মে সপ্তম ও চূড়ান্ত ধাপের ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরে নির্বাচনের সম্ভাব্য তফসিল ঘিরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার এমন বিপরীতমুখী অবস্থান প্রশাসনিক মহলে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বিশাল ভৌগোলিক পরিধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন এবং বাজেট ছাড়ের বিষয় সরাসরি সরকারের সদিচ্ছা ও প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল।
এই বাস্তবতায় দুই সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী রূপরেখা বাস্তবায়নে কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।