সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার থেকে দেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে - মাহদী আমিন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

মঙ্গলবার থেকে দেশের শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে - মাহদী আমিন
ছবি : Collected

বাংলাদেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান জ্বালানি সংকট নিরসনে একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর সামনে এসেছে। মঙ্গলবার থেকে দেশের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানায় জ্বালানির এই তীব্র ঘাটতি ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করবে বলে জানিয়েছে সরকার।

 

সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্প কারখানাগুলো, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ও অন্যান্য ভারী শিল্পগুলো যে ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল, এই ঘোষণার মাধ্যমে সেই অচলাবস্থা নিরসনের একটি সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক পথ তৈরি হলো।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের এই জ্বালানি পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, কেননা এটি সরাসরি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বহির্বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।

 

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের বৃহৎ শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। কলকারখানার চাকা সচল রাখতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ যেকোনো দেশের জন্যই অত্যন্ত অপরিহার্য।

 

মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে এই জাতীয় সংকটের দৃশ্যমান উন্নতি ঘটতে যাচ্ছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এই ঘোষণার পর শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে।

 

তারা গভীরভাবে প্রত্যাশা করছেন যে, জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হলে থমকে থাকা উৎপাদন প্রক্রিয়া তার পূর্ণ গতি ফিরে পাবে। ফলশ্রুতিতে, সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সরাসরি অবদান রাখবে।

 

বর্তমান সরকার শুধু এই তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না; বরং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী, টেকসই ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

 

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, আগামী ২০২৮ সালের আগেই দেশে নতুন একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল সম্পূর্ণভাবে চালু করার বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

 

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বর্তমান সরকারের একটি বৃহৎ ও যুগোপযোগী রূপরেখা রয়েছে। পূর্বের চালু থাকা দুটি টার্মিনালসহ ভবিষ্যতে মোট পাঁচটি এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনার পরিকল্পনা সরকারের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

 

এই মেগা প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার মধ্যেও দেশের অভ্যন্তরে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক বেশি সহজতর হবে।

 

পাশাপাশি, দেশের বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্যও সরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার অংশ হিসেবে বিকল্প জ্বালানির ওপর এখন থেকে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।

 

মুখপাত্র মাহদী আমিন তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় গ্রিডে সৌরশক্তির ব্যবহারকে এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী।

 

এছাড়া, কেবল ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের ওপর নির্ভর না করে সরকার এখন স্থলভিত্তিক বা ল্যান্ডবেজ টার্মিনাল নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে।

 

দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও বিগত সময়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাহদী আমিন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে যে পুঞ্জীভূত সমস্যার পাহাড় তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি বা মাত্র একদিনের জাদুকরী চেষ্টায় সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

বছরের পর বছর ধরে চলা চরম অব্যবস্থাপনার কারণে জ্বালানি খাত যে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। তবে তিনি এই চলমান সংকটকে কেবল নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে দেশবাসীর সামনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন।

 

তার সুচিন্তিত মতে, বর্তমান সময়ের প্রতিটি সমস্যা বা সংকটই দেশ ও জাতির সামনে নতুন কোনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এবং একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের পথ প্রশস্ত করবে। সার্বিকভাবে, সরকারের এই সময়োচিত পদক্ষেপগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে তারা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শিল্প খাতের জ্বালানি সংস্কারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

 

যদি সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাসমান ও স্থলভিত্তিক টার্মিনালগুলো যথাসময়ে আলোর মুখ দেখে এবং সৌরশক্তির মতো পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির সঠিক বিস্তার ঘটে, তবে বাংলাদেশের শিল্প খাত অচিরেই এক অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব লাভ করবে।

 

মঙ্গলবারের এই প্রাথমিক সমাধানের পাশাপাশি উল্লিখিত দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগগুলো সফল হলে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এক নতুন ও মজবুত উচ্চতায় পৌঁছাবে।