মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষা করাই এখন জাতির প্রধান দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম

অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষা করাই এখন জাতির প্রধান দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
ছবি : Collected

সিলেট (১৫ সেপ্টেম্বর): দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করাই এখন রাষ্ট্রের ও নাগরিকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

মঙ্গলবার বিকেলে সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। দেশব্যাপী সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, গণতান্ত্রিক ধারায় উত্তরণ এবং দেশে সম্পূর্ণ নতুন একটি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির এই সুস্পষ্ট বক্তব্য দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

রাষ্ট্রপতি তাঁর সুদীর্ঘ, দিকনির্দেশনামূলক ও আবেগঘন বক্তৃতায় সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং অতীত রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের রক্তপাত, বহু তরুণ ও মেধাবী প্রাণের চরম আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘকালের নিরলস লড়াইয়ের বিনিময়ে একটি ভয়াবহ স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়েছে।

 

এর মধ্য দিয়ে দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা জাতির ইতিহাসে বিরল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি জাতীয় নির্বাচনের সফল আয়োজনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বিস্তারিতভাবে জানান, সেই অভাবনীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জনাব তারেক রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে বর্তমান নতুন সরকার গঠিত হয়েছে।

 

তাঁর মতে, সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি বৃহৎ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কীভাবে পুনরায় জাগিয়ে তোলা যায়, নবগঠিত সরকার এখন সেই অত্যন্ত কঠিন ও নিরলস প্রচেষ্টাতেই পুরোপুরি নিবেদিত রয়েছে।

 

বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের অদম্য সাহস ও মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে একটি অত্যন্ত চমৎকার ও অর্থবহ রূপকের আশ্রয় নেন। তিনি দেশের গণতান্ত্রিক কর্মী ও স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষকে রূপকথার সেই অবিনশ্বর ‘ফিনিক্স’ পাখির সঙ্গে তুলনা করেন।

 

এই চমৎকার রূপকটির নিগূঢ় ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ফিনিক্স পাখি যেমন আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যাওয়ার পরও সেই ভস্ম বা ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়ে নতুন উদ্যমে ডানা মেলে আকাশে উড়ে যায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষেরাও বারবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েও নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।

 

শত বাধা, জুলুম ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে বারবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এই অদম্য স্পৃহাই এ দেশের আপামর জনতার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে তিনি মনে করেন। দেশের নবীন গণতন্ত্রকে সুসংহত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, বহু প্রতীক্ষিত ও কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে ফিরে পেয়েছি, এখন একে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখাটাই সরকারি ও বিরোধী দলসহ সকলের প্রধানতম কাজ। রাষ্ট্রপতির সুচিন্তিত মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষেরই মূল দায়িত্ব হলো জাতীয় সংসদকে শতভাগ কার্যকর করা।

 

সংসদ যেন সত্যিকার অর্থেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন নীতিগত ইস্যুতে মতপার্থক্য বা দ্বিমত থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি গণতান্ত্রিক চর্চা।

 

তবে সেই সকল দ্বিমত ও বিরোধ কেবল রাজপথের সংঘাত দিয়ে নয়, বরং জাতীয় সংসদের ভেতরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ আলাপ-আলোচনা ও গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমেই একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।

 

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, অতীতে এ দেশের মানুষ যেমন শুধুমাত্র হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য রাজপথে দিনের পর দিন রক্তক্ষয়ী লড়াই করেছে, সামনের দিনগুলোতে আমাদের সকলের সম্মিলিত মূল লড়াই হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত এই দেশকে নতুন করে পুনর্গঠন করার এবং সদ্যপ্রাপ্ত গণতন্ত্রের শেকড়কে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করার।

 

দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকামী মানুষ অতীতে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য বহুবার সংগ্রাম করেছে এবং বারবার দেশি-বিদেশি নানা সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের কারণে মাঝপথে হোঁচট খেয়েছে। বহু রক্ত ও বাধা পেরিয়ে আজকে সমগ্র জাতি যে একটি ঐতিহাসিক ও সোনালি সুযোগ লাভ করেছে, নিজেদের অবহেলা, বিভেদ বা দায়িত্বহীনতার কারণে কোনোভাবেই যেন সেই অমূল্য সুযোগ চিরতরে হাতছাড়া না হয়, সে বিষয়ে তিনি দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে সর্বদা সতর্ক থাকার বিনীত আহ্বান জানান।

 

অনুষ্ঠানের শেষাংশে রাষ্ট্রপতি সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় উন্নয়ন এবং জনগণের প্রাত্যহিক বিভিন্ন সমস্যার বিষয়েও অত্যন্ত ইতিবাচক, গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক কথা বলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় নাগরিকদের উত্থাপিত বিভিন্ন যৌক্তিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সকলকে আন্তরিকভাবে আশ্বস্ত করেন যে, সিলেটের সার্বিক উন্নয়নে বর্তমান সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত যোগ্য, পরিশ্রমী ও আন্তরিক।

 

স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়ে তারা ইতোমধ্যেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিশদ আলোচনা শুরু করেছেন এবং বেশ কিছু বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলমান রয়েছে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সকল যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের হাত ধরেই আগামী দিনগুলোতে সিলেটের অসমাপ্ত কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং এর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত আশা ও আকাঙ্ক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটবে।