আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ এই জোটের নবনির্বাচিত মহাসচিব ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ওআইসির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার এই জোরালো আশ্বাস প্রদান করেছেন।
তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই অমানবিক ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের যদি দ্রুত কোনো স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা না হয়, তবে তা সমগ্র এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রের জন্যই অবর্ণনীয় ভোগান্তি ও বহুমুখী সংকটের কারণ হতে পারে। গত বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের বন্দরনগরী জেদ্দায় অবস্থিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদর দপ্তরে নবনির্বাচিত মহাসচিবের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ওআইসিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রদূত এম জে এইচ জাবেদ।
এই বিশেষ কূটনৈতিক সাক্ষাতের সময় রাষ্ট্রদূত জাবেদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানের পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি আনুষ্ঠানিক অভিনন্দনপত্র নতুন মহাসচিবের হাতে তুলে দেন।
অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেই ওআইসি মহাসচিব বাংলাদেশের প্রতি তার সংস্থার অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহমর্মিতার কথা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদূত জাবেদ এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আন্তরিক শুভেচ্ছা বার্তা মহাসচিবের কাছে পৌঁছে দেন এবং তার এই নতুন ও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন, সহযোগিতা ও অবিচল অঙ্গীকার অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠককালে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণের প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন ওআইসি মহাসচিব ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী, প্রজ্ঞাবান ও গতিশীল নেতৃত্বে দেশটির চলমান উন্নয়ন, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এক নতুন ও অভাবনীয় গতি লাভ করবে।
বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের এই নতুন যাত্রায় এবং যেকোনো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটে ওআইসি সব সময় এক বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে বলেও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের গাজীপুরে অবস্থিত ওআইসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ বা আইইউটির অসামান্য অবদানের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহাসচিব।
তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ওআইসিভুক্ত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে এবং একুশ শতকের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল ধরে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে আসছে।
বর্তমান বিশ্বের অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কথা মাথায় রেখে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ অন্যান্য আধুনিক ও যুগোপযোগী বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে আইইউটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ওআইসির পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই নতুন, সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার সুস্পষ্ট আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।
দ্বিপক্ষীয় এই দীর্ঘ বৈঠকে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। উভয় পক্ষই এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেন যে, ওআইসিভুক্ত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার যে অপরিসীম বৈচিত্র্য রয়েছে, তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও বহুগুণে সমৃদ্ধ করতে পারে।
বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবাধ বিনিময়, সম্ভাবনাময় আতিথেয়তা শিল্প এবং যুগোপযোগী শিক্ষা খাতের মতো বিভিন্ন উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ ও বাস্তবমুখী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক লাভজনক নীতির ভিত্তিতে একসঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে পারে।
এটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ভিতকে আরও সুদৃঢ় ও টেকসই করবে বলে তারা মত প্রকাশ করেন। বৈঠকের শেষ পর্যায়ে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এবং নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অত্যন্ত ইতিবাচক, গঠনমূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের জন্য ওআইসি মহাসচিবকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানান রাষ্ট্রদূত এম জে এইচ জাবেদ।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সাধারণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সচিবালয়ের সঙ্গে আরও নিবিড় ও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে বাংলাদেশ গভীরভাবে আগ্রহী।
একই সঙ্গে ওআইসি মহাসচিব অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানান যে, তার আগামী আনুষ্ঠানিক সফরসূচির পরিকল্পনায় পছন্দের তালিকার একেবারে শীর্ষ সারিতেই রয়েছে বাংলাদেশের নাম। এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের প্রতি ওআইসির বিশেষ গুরুত্ব ও সুগভীর সম্পর্কেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন বহন করে।