বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ

তিন মেট্রোরেল প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও ব্যয় বৃদ্ধি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

তিন মেট্রোরেল প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও ব্যয় বৃদ্ধি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন এবং একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।

 

ঢাকা মহানগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াতকে আরও নির্বিঘ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে তিনটি বৃহৎ মেট্রোরেল বা এমআরটি প্রকল্পের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

 

অনুমোদিত এই তিনটি মেগা প্রকল্পের সর্বমোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, চলমান দুটি মেট্রো প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ইতিহাসে একটি বিশাল আর্থিক সংযোজন।

 

গত বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।

 

দীর্ঘ এই নীতিনির্ধারণী বৈঠকে মেট্রোরেলের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পসহ সর্বমোট ১২টি উন্নয়ন প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৭টি সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোগ এবং বাকি ৫টি চলমান প্রকল্পের সংশোধিত রূপ হিসেবে সভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল।

 

সভা শেষে একনেকের সার্বিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত আর্থিক ও কাঠামোগত বিষয়াদি নিয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, একনেক সভার মূল আলোচ্যসূচিতে প্রাথমিকভাবে কেবল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা নির্ধারিত ছিল।

 

তবে নগরবাসীর ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং সমগ্র ঢাকা শহরকে একটি সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করার সুস্পষ্ট স্বার্থে, জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় চলমান আরও দুটি মেগা প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব একই সঙ্গে অনুমোদনের জন্য একনেকের টেবিলে উপস্থাপন করা হয় এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

 

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত আর্থিক ও কাঠামোগত চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সর্বপ্রথম পাতাল মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটির বাস্তবায়নে সংশোধিত ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

 

এই মেগা প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় এক ধাক্কায় ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় এই ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

 

কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী ২০৩৩ সালের মধ্যে এই পাতাল রেলের যাবতীয় নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তকে যুক্ত করার লক্ষ্যে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের জন্যও বিপুল পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

এই মেগা প্রকল্পটির প্রধান নির্মাণকাজ হলো সাভারের হেমায়েতপুর থেকে রাজধানীর ভাটারা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন মেট্রোরেল করিডোর তৈরি করা। এই প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

 

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে এর সঙ্গে আরও ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে প্রকল্পটির সংশোধিত মোট ব্যয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

 

এর পাশাপাশি, রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন নামক নতুন মেগা প্রকল্পটি খুব দ্রুতই আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে বলে সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

 

এই নতুন পাতাল ও উড়াল মেট্রো সমন্বিত প্রকল্পে মোট প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা।

 

আর বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের জোগান আসবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বা ইডিসিএফ-এর যৌথ ঋণ সহায়তা থেকে।

 

প্রকৌশলগত দিক থেকে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত এই লাইনের মোট দৈর্ঘ্যের মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশ থাকবে সম্পূর্ণ মাটির নিচে এবং বাকি অংশটুকু হবে উড়াল বা এলিভেটেড পথ।

 

এই মেট্রো রুটটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার এবং তেজগাঁও এলাকার মতো রাজধানীর অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোকে স্পর্শ করবে।

 

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই রেললাইনটি ঢাকার ফুসফুস খ্যাত হাতিরঝিলের তলদেশ দিয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে, যার জন্য ভূপৃষ্ঠের মাটি থেকে ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সুবিশাল ভূগর্ভস্থ টানেল নির্মাণ করা হবে। আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এই অসামান্য প্রয়োগ নগরবাসীর প্রাত্যহিক যাতায়াত ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে।