বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই উচ্চপর্যায়ের সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকী অনুমোদিত মেগা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন খাতের এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করেছে। সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক উপস্থাপিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, একনেক সভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত এই বারোটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত সর্বমোট ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে এক লক্ষ আটষট্টি হাজার সাতশো আশি কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা।
এই সুবিশাল ব্যয়ের খাতভিত্তিক ও উৎসগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সরাসরি অর্থায়ন করা হবে আটচল্লিশ হাজার দুইশো ছাপ্পান্ন কোটি ত্রিশ লক্ষ টাকা। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে এক লক্ষ বিশ হাজার চারশো ছেষট্টি কোটি ঊনচল্লিশ লক্ষ টাকা।
এর বাইরে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে সাতান্ন কোটি একাত্তর লক্ষ টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অনুমোদিত এই বারোটি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি সম্পূর্ণ নতুন উদ্যোগ এবং বাকি পাঁচটি চলমান প্রকল্পের সংশোধিত রূপ।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সর্বোচ্চ পাঁচটি বড় মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজট নিরসন এবং একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেল নির্মাণের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রুট এই তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে।
এগুলোর মধ্যে লাইন-ফাইভের সাউদার্ন রুট, নর্দান রুটের প্রথম সংশোধিত রূপ এবং লাইন-ওয়ানের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প অন্যতম। এর বাইরে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ়, নিরাপদ ও গতিশীল করার জন্য রাজশাহী সড়ক জোনের বিভিন্ন জেলা মহাসড়কগুলোকে যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ এবং চট্টগ্রাম সড়ক জোনের জেলা মহাসড়কগুলোর মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণের তৃতীয় পর্যায়ের বৃহৎ কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেলপথেও আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগতে যাচ্ছে। যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি অত্যন্ত যুগান্তকারী প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে। এর মধ্যে পরিবেশবান্ধব, দ্রুতগতিসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত সেকশনে ইলেকট্রিক ট্রাকশন বা বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবস্থা চালুকরণ প্রকল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটিও এই সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে।
অন্যদিকে, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায় এবং খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য আধুনিক আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণের দুটি আলাদা প্রকল্পও একনেকের সবুজ সংকেত পেয়েছে।
এছাড়াও দেশের শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের কল্যাণে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেক্সটাইল এবং চামড়া খাতের বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর উন্নয়নের একটি সময়োপযোগী প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
উপরোক্ত মেগা প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনা মহানগরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সার্বিক আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প এবং দ্বীপজেলা ভোলার সাগরবেষ্টিত মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
এছাড়াও, একনেকের এই নীতিনির্ধারণী বৈঠকে পঞ্চাশ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত আরও পনেরোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকল্পের তালিকা অবগতির জন্য উপস্থাপন করা হয়। বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, পঞ্চাশ কোটি টাকার কম বাজেটের প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা মন্ত্রী তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাবলে সরাসরি অনুমোদন করতে পারেন, তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে সেগুলো পরবর্তীতে একনেক সভাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক পূর্বানুমোদিত এবং একনেক সভায় অবহিত করা এই পনেরোটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণের প্রথম সংশোধনী এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী প্রতিষ্ঠা ও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপক পুনর্বনায়নের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে দেশি মুরগি গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জোরদারকরণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনের প্রথম পর্যায়ের সংশোধিত প্রকল্পটিও এই তালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে রংপুর জোনে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ও অন্যান্য সেতু দ্রুততম সময়ে প্রতিস্থাপন, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে পঞ্চম থেকে দশম তলা পর্যন্ত নির্মাণ এবং জালালাবাদ সেনানিবাসের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন কোয়ার্টার গার্ড নির্মাণের মতো বিষয়গুলোও একনেককে অবহিত করা হয়েছে।
এর বাইরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সিলেট বিভাগে বন্যার নিখুঁত পূর্বাভাসের জন্য একটি অত্যাধুনিক ত্রিমাত্রিক বা থ্রি-ডি মডেল প্রস্তুতকরণের সংশোধিত প্রকল্প, শিক্ষাক্ষেত্রে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং খুলনা মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুলের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণ প্রকল্পের সংশোধিত রূপ এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রসারে বরগুনা ও দিনাজপুর জেলা স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন কাজের কথা সভায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
দেশের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সিলেট-দশ নম্বর গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প সম্পর্কেও কমিটিকে অবহিত করা হয়েছে, যা আগামীর ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় বিশেষ অবদান রাখবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করা হয়েছে।