এই ঐতিহাসিক সংশোধনীর আওতায়, সদ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বহুল পরিচিত দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’-কে নির্বাচন কমিশনের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় যুক্ত করে ব্যালট কাগজে ‘না’ ভোট প্রদানের একটি বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত যেসব আসনে একক প্রার্থী থাকবেন, সেখানে ভোটারদের মতপ্রকাশের অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বুধবার রাতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি প্রজ্ঞাপনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়, যা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারি করা ওই সরকারি প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে প্রদত্ত বিশেষ আইনি ক্ষমতাবলে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা-২০০৮-এর বিধি ৯-এর উপবিধি (১)-এ এই যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী সংশোধন আনা হয়েছে।
সংশোধিত এই নতুন বিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা নির্ধারিত প্রতীকের চূড়ান্ত তালিকা থেকে স্থগিত করা প্রতীকটি ব্যতীত অন্য যেকোনো প্রতীক বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে আইনি নিয়ম সাপেক্ষে বরাদ্দ দেওয়া যাবে।
প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রতীকের হালনাগাদ তালিকায় অন্যান্য সব নির্বাচনী প্রতীকের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ‘নৌকা’ প্রতীকের ঠিক পাশেই ‘স্থগিত’ শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখার লক্ষ্যে, যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য কেবল একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী থাকবেন, সেখানে ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং পছন্দের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যালট কাগজে ‘না’ প্রতীকের একটি আলাদা ঘর রাখা হবে।
এর ফলে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে চাইলে সেই একক প্রার্থীকেও আইনিভাবে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, যা নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। নির্বাচন কমিশনের একটি উচ্চপদস্থ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত জানা গেছে যে, এই সংশোধনীর মাধ্যমে কেবল দলীয় প্রতীক স্থগিত বা নতুন প্রতীক সংযোজনের মাঝেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি কমিশন; বরং সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানের জটিল প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত করে তুলতে প্রার্থীর হলফনামা দাখিলের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু কাঠামোগত ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন এই সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং নির্ভরশীল অন্য কোনো সদস্যের আয়কর সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য হলফনামায় প্রদান করার যে আইনি বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল, তা পুরোপুরি শিথিল করে সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক করা হয়েছে।
ফলস্বরূপ, এখন থেকে কোনো প্রার্থী যদি তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর বিবরণী সংক্রান্ত নথিপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা নাও দেন, তাহলেও তার মনোনয়নপত্রটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
এর পাশাপাশি, বিধিমালার ৩(গ) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত ‘অভিযুক্ত’ শব্দটির একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। নতুন এই আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অভিযুক্ত বলতে কেবল সেই সব ব্যক্তি বা আসামিকে বোঝানো হবে, যাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কোনো উপযুক্ত আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
ফৌজদারি বা অন্য কোনো অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীদের জামিন সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আগের কঠোর ও জটিল বিধিমালাকে অনেকটাই শিথিল এবং সহজীকরণ করা হয়েছে এই নতুন প্রজ্ঞাপনে। পূর্ববর্তী আইনি নিয়মে, কোনো প্রার্থী যদি আদালত থেকে জামিনে মুক্ত থাকতেন, তবে তাকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আদালত থেকে প্রাপ্ত জামিনের আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক ছিল।
কিন্তু বর্তমান সংশোধনীতে প্রার্থীদের হয়রানি কমাতে এই আইনি বাধ্যবাধকতা সহজ করা হয়েছে। অপরদিকে, যেসব প্রার্থী বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন এবং সেখান থেকেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক, তাদের আইনি অধিকারও এই প্রজ্ঞাপনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সর্বশেষ বিধান অনুযায়ী, কারাবন্দি প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিলযোগ্য হলফনামাসহ অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সরাসরি কারাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথভাবে সত্যায়িত করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে পারবেন।
প্রার্থীদের দৈনন্দিন নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের সুবিধার্থে ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী আইনি সংশোধনী নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল-১-এর ফরম-১-এর তৃতীয় অংশে উল্লেখিত ‘মনোনীত প্রার্থী কর্তৃক ঘোষণা’ নামক স্থানে পূর্বে কেবল প্রার্থীর নিজস্ব ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।
কিন্তু সংশোধিত নতুন নিয়মে, প্রার্থীরা তাদের দৈনন্দিন নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি তাদের দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত নির্বাচনী প্রতিনিধির ব্যাংক হিসাবও ব্যবহার করার সম্পূর্ণ আইনগত সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, জনস্বার্থে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে গৃহীত এই সকল সংশোধিত আইনি বিধান প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই অবিলম্বে কার্যকর বলে গণ্য হবে এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই নতুন নিয়মগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে ও কঠোরতার সঙ্গে প্রযোজ্য হবে।