দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন সম্ভাবনাগুলোকে আর বিচ্ছিন্নভাবে না রেখে, একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই রূপকল্প বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারত্ব এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত।
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকায় আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ১৩তম ‘এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ড যেখানে অপরূপ নদীমাতৃক দৃশ্য, সবুজে ঘেরা পাহাড়, সুবিশাল সমুদ্র এবং গহিন বনাঞ্চলের এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান কুয়াকাটার মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের রয়েছে।
এর পাশাপাশি সিলেটের নয়নাভিরাম চা-বাগান, বিস্তৃত নদী ও জলাভূমি এবং হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অত্যন্ত শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে মন্ত্রী অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানান যে, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা কেবল গুটি কয়েক সুপরিচিত গন্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের, প্রতিটি জেলারই নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এই বিচ্ছিন্ন সম্ভাবনাগুলোকে একত্রিত করে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডে প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করা।
এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণির পর্যটন আকর্ষণগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সর্বাধুনিক মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
একই সঙ্গে, পর্যটন খাতের উন্নয়নে বেসরকারি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, পর্যটন খাতের এই পরিকল্পিত উন্নয়ন কেবল সরকারের একটি সাধারণ প্রশাসনিক অগ্রাধিকারই নয়, বরং এটি বর্তমান সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনয়ন, বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সারা দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার যে বৃহত্তর জাতীয় পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, পর্যটন খাতকে তার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথাও মন্ত্রী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, কক্সবাজারের সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের আঞ্চলিক পর্যটন কেন্দ্র বা হাব হিসেবে গড়ে তোলার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
নতুনভাবে আধুনিকায়ন করা কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরাসরি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা এবং তাদের যাতায়াত সহজতর করা।
পাশাপাশি, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ঘিরেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পর্যটন খাতের এই অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে মন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগোষ্ঠীকেও পর্যটন কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া পর্যটন খাতকে কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে সরকারকে যেমন নীতিগত সহায়তা দিতে হবে, তেমনি বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনসাধারণকে একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের যে অবদান রয়েছে, সেখান থেকে এটিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে প্রতিনিয়ত নতুন, উদ্ভাবনী এবং একই সঙ্গে ব্যয়-সাশ্রয়ী সৃজনশীল ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রাজধানীতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মানের এই পর্যটন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
মেলা আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যটন শিল্পের প্রসার ও প্রচারের লক্ষ্যে আয়োজিত এই ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলা প্রাঙ্গণ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সকলের জন্য খোলা থাকছে।
এবারের মেলায় বাংলাদেশসহ এশিয়া ও বিশ্বের মোট ১০টি দেশের প্রায় ২০০টিরও বেশি স্বনামধন্য পর্যটন ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের সেবার পসরা সাজিয়ে প্রায় ৩০০টি সুসজ্জিত বুথে অংশগ্রহণ করছে, যা দেশের পর্যটন খাতের বিকাশে এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।