তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, বাসযোগ্য এবং বৈষম্যহীন নগরী গড়ে তোলাই তাঁর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শুক্রবার, আঠারোই সেপ্টেম্বর নগরীর দেওয়ানজী পুকুর পাড় এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলা সৎসঙ্গের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের ১৩৯তম আবির্ভাব দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী মহামহোৎসবের তৃতীয় দিনে এই আলোচনা সভা ও মহামঙ্গল শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উৎসবমুখর এই বিশাল আয়োজনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নগরীর অসাম্প্রদায়িক চেতনারই এক অনন্য প্রতিফলন ঘটায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, চট্টগ্রাম এমন এক ঐতিহ্যবাহী নগরী, যেখানে স্মরণকাল থেকে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল থেকে এক অটুট সম্প্রীতির বন্ধন বজায় রেখে চলেছে।
দীর্ঘদিনের এই সামাজিক ও ধর্মীয় ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য যদি কোনো মহল অপচেষ্টা চালায়, তবে তা সম্মিলিতভাবে এবং কঠোর হস্তে রুখে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। মেয়র সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উসকানিতে পা দিয়ে শত বছরের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
নগরীর প্রতিটি স্তরে সব ধর্মের মানুষের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। মেয়র তাঁর ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক লক্ষ্যের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে জানান যে, তিনি সব সময় দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে অবস্থান করেন।
চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর এবং শতভাগ নিরাপদ নগরী হিসেবে নতুন রূপে সাজিয়ে তুলতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সরকারের নীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের লুণ্ঠিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে বর্তমান বিএনপি সরকার সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ ও বদ্ধপরিকর।
তিনি জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন অত্যন্ত স্বাধীন, নির্বিঘ্নে এবং পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অধিকার ও আচার-অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে সকলের সমান আইনি ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি সকলকে আশ্বস্ত করেন। নিজেকে ক্ষমতাধর নগরপিতার বদলে শহরের সাধারণ মানুষের একজন বিনয়ী সেবক হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে মন্তব্য করেন ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই এমন একটি অনন্য ও সহনশীল ভূখণ্ড, যেখানে আবহমানকাল ধরে সকল ধর্মের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছে।
বর্তমান এই ধর্মীয় উৎসবটিও অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং আনন্দঘন পরিবেশে সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উপস্থিত সকলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য মাঠে থেকে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে।
পরিশেষে তিনি আগত পুণ্যার্থী এবং নগরবাসীর প্রতি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, একে অপরকে সার্বিক সহযোগিতা করা এবং উৎসবের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান।
এই তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতির ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার ধর্ম, বর্ণ, আর্থসামাজিক শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ, আধুনিক ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এই গভীর দেশপ্রেমমূলক ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ এই স্বাধীন ভূখণ্ডের সমান অংশীদার ও নাগরিক। তাই নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্প্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমেই একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করে সমগ্র জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।