শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম

তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে এবং শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহাসিক তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

 

দেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। নতুন খননকৃত এই কূপটি থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা এক কোটি পঁচিশ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অর্থনৈতিক ও জ্বালানি বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নিজস্ব জ্বালানি উৎসের সম্প্রসারণ আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

 

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের এই নতুন কূপটির খনন ও উৎপাদনের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের নিখুঁত কারিগরি পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের নিরলস প্রচেষ্টা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর এলাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই ২৮ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু করা হয়েছিল।

 

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারিগরি মানদণ্ড বজায় রেখে চলতি বছরের ২৭ মে এই খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এরপর কারিগরি নিরাপত্তা ও উৎপাদন সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য গত ১৯ জুন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়েছিল।

 

অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, পরীক্ষামূলক সেই পর্যায় থেকেই এই কূপটি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এই কূপ থেকে ইতোমধ্যে প্রায় দুইশ কোটি টাকা সমমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাস সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের সাশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

প্রকল্পটির কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছেন ২৮ নম্বর কূপের প্রকল্প পরিচালক জসিম উদ্দিন মুন্না। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, কূপটির বর্তমান কারিগরি অবস্থা অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সরবরাহের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

 

কারিগরি পরিভাষায় কূপটির ওয়েলহেড শাট-ইন প্রেসার বা সংরক্ষিত চাপ রেকর্ড করা হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ পিএসআই। অন্যদিকে, ফ্লোয়িং প্রেসার বা প্রবহমান চাপ রয়েছে ২ হাজার ১০০ পিএসআই।

 

এই উন্নত প্রবহমান চাপের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত আশাবাদী যে, কোনো ধরনের বড় কারিগরি বিঘ্ন ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে।

 

বর্তমানে প্রতিদিন ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে যে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার যাবতীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত সাংবাদিক ও সুধীসমাজের সামনে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং শিল্প ও আবাসিক খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার একটি সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।

 

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশব্যাপী মোট ১৫০টি নতুন গ্যাস কূপ খননের যে বড় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিতাস ২৮ নম্বর কূপ থেকে শুরু হওয়া এই ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগগুলো একত্রিত হয়ে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি খাতের বিপুল চাহিদা এবং বিদ্যমান সরবরাহের মধ্যকার ব্যাপক পার্থক্য দূর করতে অভাবনীয় সহায়তা করবে।

 

প্রতিমন্ত্রীর মতে, নতুন এই কূপের গ্যাস জাতীয় অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

উদ্বোধনী এই আড়ম্বরপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জলিল প্রামানিকসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের এই সর্বোচ্চ ও পরিকল্পিত ব্যবহার একদিকে যেমন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে ত্বরান্বিত করবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যের চরম অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে একটি বড় ধরনের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন।