আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের দৃষ্টি এখন এই সফরের দিকে নিবদ্ধ, কারণ এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার, চলমান কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম, দেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং একটি 'নতুন বাংলাদেশ' বিনির্মাণের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন তিনি।
এই ঐতিহাসিক সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ও বিরল নজির স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায়, একই পরিবারের তৃতীয় রাজনীতিক হিসেবে জাতিসংঘের মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দেশের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বৈষম্য দূর করার ওপর জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন। পরবর্তীতে, ২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলন বা ওয়ার্ল্ড সামিটসহ একাধিক উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন খালেদা জিয়া।
তিনি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সর্বজনীন মানবাধিকারের চিত্র সুচারুরূপে উপস্থাপন করেছিলেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টনের মতে, পূর্বসূরিদের সেই গৌরবোজ্জ্বল পথ ধরে তারেক রহমানের এই ভাষণও দেশের ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে বিশ্বমঞ্চে আরও সুদৃঢ় করবে।
কূটনৈতিক সূত্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর একটি অত্যন্ত কর্মব্যস্ত সময় পার করবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে তিনি নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করবেন। সফরের শুরুতেই জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই শীর্ষ বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও প্রশংসনীয় অবদান, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্যকর অংশীদারত্বের মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে প্রাধান্য পাবে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক পার্শ্ববৈঠকের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কৌশলগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
এছাড়া, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক একাধিক উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন।
সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে দেশের নাগরিকদের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্প্রতি যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিল। গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়, যার উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এবং সাধারণ বিতর্ক চলবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-'আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ'। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ সেপ্টেম্বর 'এসডিজি মোমেন্ট' অনুষ্ঠিত হয়, যার স্লোগান ছিল 'একসঙ্গে, আমরা পারব'।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসডিজির ১৩৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ সঠিক পথে রয়েছে। অর্থায়নের তীব্র ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, বৈশ্বিক ঋণসংকট, সংঘাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির সৃষ্ট সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার উপায় নিয়েও এবারের অধিবেশনে বিশ্বনেতারা নিবিড়ভাবে মতবিনিময় করছেন।
এদিকে, দীর্ঘ বিরতির পর দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশি ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে এক অভাবনীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে বিপুল ও বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা জানাতে ইতিমধ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ এবং বোস্টন বিএনপির সভাপতি বদরা সাইদ জানিয়েছেন যে, নেতার আগমনে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে এবং বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের বিশাল ঢল নামবে।
নিউইয়র্ক দক্ষিণ মহানগর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা এই ক্ষণটিকে তৃতীয় প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক অনন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং গর্বের বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এছাড়া যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবু সাঈদ আহমেদ এবং সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তোফায়েল লিটন চৌধুরী মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সফর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।