শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপ্রতিম হত্যায় এসআরবির হাতে আরও এক সন্দেহভাজন আটক

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

অপ্রতিম হত্যায় এসআরবির হাতে আরও এক সন্দেহভাজন আটক
ছবি : Collected

বাংলাদেশের কুমিল্লার একটি আবাসিক ও সুরক্ষিত এলাকা বলে পরিচিত কোটবাড়িতে সংঘটিত এক কিশোরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড পুরো দেশজুড়ে গভীর চাঞ্চল্য ও শোকের সৃষ্টি করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, তেরো বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।

 

এই চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি আরও একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।

 

নতুন এই আটকের মধ্য দিয়ে অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মোট আটকের সংখ্যা এখন দুয়ে উন্নীত হলো। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১১, সিপিসি-২ (কুমিল্লা ক্যাম্প)-এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে এই দ্বিতীয় আটকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সদ্য আটক হওয়া সন্দেহভাজন এই ব্যক্তির নাম মো. আনাস। তদন্তের চরম স্বার্থে এবং আইনি প্রক্রিয়ার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় আনাসের বিস্তারিত পরিচয় বা ঠিকানার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে আর কোনো অতিরিক্ত তথ্য প্রদান করা হয়নি।

 

তবে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও অন্যান্য জড়িতদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে তাকে এসআরবির নিজস্ব হেফাজতে নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

 

এর আগে, এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রবল সন্দেহে পুলিশ তুহিন নামের আরও এক যুবককে আটক করেছিল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, মূলত একটি দামি স্মার্টফোন বা আইফোন ছিনতাই করার হীন উদ্দেশ্যেই এই নির্মম ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।

 

সামান্য একটি যন্ত্রের লোভে একটি সম্ভাবনাময় কিশোরের এমন অকাল মৃত্যু সমাজের বর্তমান নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়ংকর দিক উন্মোচন করেছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা প্রথম সন্দেহভাজন তুহিনকেও এই ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, আটককৃত দুই সন্দেহভাজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই জঘন্য অপরাধের পেছনের সম্পূর্ণ চিত্রটি খুব দ্রুতই দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে।

 

ওই দিন বিকেলে ১৩ বছর বয়সী কিশোর অপ্রতিম অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তার মায়ের ব্যবহৃত একটি আইফোন সঙ্গে নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু ছবি তোলার উদ্দেশ্যে কোটবাড়ি এলাকার নিজ বাসা থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও সে আর তার মায়ের কোলে বা নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসেনি।

 

আদরের সন্তান দীর্ঘ সময় ধরে বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য সব জায়গা ও আত্মীয়স্বজনের কাছে খোঁজ নিয়েও অপ্রতিমের কোনো সন্ধান না পেয়ে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার চরম হতাশা ও আতঙ্কের মধ্যে ওই রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি বা জিডি দায়ের করেন।

 

এরপর থেকেই মূলত নিখোঁজ কিশোরের সন্ধানে প্রশাসন তাদের তৎপরতা শুরু করে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় শনিবার দুপুরে সকল আশার প্রদীপ নিভে গিয়ে এক ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয় পরিবারটি।

 

শনিবার দুপুরের দিকে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এবং ঐতিহাসিক লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের একটি নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে অপ্রতিমের নিথর মরদেহ উদ্ধার করে।

 

যে বয়সে একটি শিশুর হাসিখুশি ও দুরন্তপনায় পুরো বাড়ি মুখরিত থাকার কথা, সেই বয়সেই তাকে এমন পৈশাচিক হত্যার শিকার হতে হলো, যা পুরো এলাকাকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে। নিহত অপ্রতিম স্থানীয় কোটবাড়ি এলাকার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল।

 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুরক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয়দের সার্বিক নিরাপত্তা বোধকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ড. নাহিদা বেগমের মতো একজন বিদ্যানুরাগী ও সম্মানিত শিক্ষকের জীবনে নেমে আসা এই অবর্ণনীয় শোক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ সমগ্র শিক্ষক ও ছাত্রসমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া ফেলেছে।

 

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং এটি একটি সুস্থ সমাজের জন্য গভীর অশনিসংকেত। অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বদ্ধপরিকর যে, কোনো অপরাধীই এই ঘটনায় ছাড় পাবে না এবং অচিরেই পুরো ঘটনাটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মীমাংসিত হবে।