দীর্ঘ সময় পর সম্পূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের শীর্ষ নেতা হিসেবে তাঁর এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বৈশ্বিক এই সফরের মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য গণমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সোমবার রাত নয়টায় নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত বিলাসবহুল ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলের লবিতে এই বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরপরই প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন।
সেখানে মুখপাত্র মাহ্দী আমিন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানান যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর এই ঐতিহাসিক সফরে দেশপ্রেম, আবেগ, জনগণের গভীর অনুভূতি এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য রাখবেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্প ঠিক কেমন হওয়া উচিত, পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নিবিড় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়গুলোই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে যে ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার একটি বস্তুনিষ্ঠ ও স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাহ্দী আমিন বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সফরে নিউইয়র্কে এসেছেন।
দীর্ঘদিন পর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক ও সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আমন্ত্রিত হয়েছেন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বিশ্বমঞ্চে এই সগর্ব উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিশাল ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ও আবেগঘন একটি প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। মুখপাত্র স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্বে থাকাকালীন বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত সাহসিকতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ রূপকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন।
ইতিহাসের সেই গৌরবময় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই আজ তাঁদের সুযোগ্য সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক একইভাবে বাবা-মায়ের অকৃত্রিম দেশপ্রেমের আদর্শকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের স্বার্থ, অধিকার এবং সম্মানের কথা জাতিসংঘের মঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে কেবল একটি প্রথাগত কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় পুনর্জাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত ভাষণ প্রদান করবেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন তাঁর এই ভাষণের দিকে গভীরভাবে নিবদ্ধ। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর এই ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংগ্রাম, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরে সমতা নিশ্চিত করার মতো আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো উঠে আসবে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ভবিষ্যৎ রূপরেখাও তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে, যা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি করবে।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের আরেকটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় দিক হলো রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কৃচ্ছ্রসাধন ও মিতব্যয়িতার নীতি অনুসরণ করা। অতীতের বিশাল বহর নিয়ে বিদেশ সফরের যে ঐতিহ্য বা রীতি দেশের রাজনীতিতে প্রচলিত ছিল, বর্তমান সরকার সেই সনাতনী ধারা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রতি বর্তমান সরকারের যে দৃঢ় অঙ্গীকার, এই সফরটি তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত দুই দিন বাদ দিলে মাঝখানে মাত্র চারটি কর্মদিবস তিনি নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন এবং এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের বহর সম্পর্কে মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, প্রচলিত প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী এবার খুব ছোট্ট ও ছিমছাম একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে এসেছেন। সরকারিভাবে এই সফরে মাত্র ৩৫ জন সদস্য রয়েছেন।
এর বাইরে কেবল অত্যাবশ্যকীয় গণমাধ্যমকর্মী, অপরিহার্য নিরাপত্তাকর্মী এবং একান্ত ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত ব্যস্ত সফরসূচি শুরু হচ্ছে। এদিন সকাল ৯টায় তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্বে অংশগ্রহণ করবেন।
এই উদ্বোধনী আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত থাকবেন, যা বৈশ্বিক কূটনীতির এক অনন্য মিলনমেলা। এর আগে, মঙ্গলবার সকালেই তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ আমন্ত্রণে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে আয়োজিত একটি স্বাগত প্রাতঃরাশ সংবর্ধনায় যোগ দেবেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক আয়োজনগুলো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি, মতবিনিময় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের অত্যন্ত সাবলীল, পেশাদার ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দেন উপস্থিত সরকারের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলাদা কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ বা সম্ভাবনা আছে কি না, এমন একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানান যে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরের একমাত্র ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করা।
যেহেতু সফরটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং জাতিসংঘের বৈশ্বিক কর্মসূচিগুলো আগে থেকেই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নির্ধারিত, তাই আলাদা করে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক আলোচনার তেমন কোনো সুযোগ এবার তৈরি হবে না।
জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সগর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে সুনির্দিষ্ট রূপকল্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে।
নিউইয়র্কের এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ছাড়াও সরকারের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি ওয়াহিদুজ্জামান।