আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের রূপকল্প, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতে তিনি এই সফরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সময় সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটটি নিউইয়র্কের প্রখ্যাত জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
এ সময় তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
বিমানবন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল উৎসবমুখর এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগান ও আনন্দ উল্লাসে বিমানবন্দর এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে কঠোর নিরাপত্তা ও মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত বিলাসবহুল ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ এই সফরকালে তিনি এখানেই অবস্থান করবেন এবং এখান থেকেই তার যাবতীয় বৈশ্বিক ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
অন্যদিকে, মতপ্রকাশের বৈশ্বিক রীতির অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে বিপরীত চিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ব্যানারে কিছু মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে স্লোগান প্রদর্শন করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি প্রবাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি স্বাভাবিক প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরদিন অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
সফরের প্রথম দিন সকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে এক বিশেষ স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশগ্রহণ করবেন। এই আয়োজনটি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ হিসেবে কাজ করবে।
এরপর তিনি অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। একই দিন সন্ধ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত একটি রাজকীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করবেন।
রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার প্রধানমন্ত্রীর দিনলিপি শুরু হবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন দাতব্য ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতঃরাশ বৈঠকের মধ্য দিয়ে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং মানবিক সংকটে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
এরপর তিনি বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সভায় বক্তব্য রাখবেন। এই সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেন।
বিকেলে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ (জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর) শীর্ষক একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করবেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অধিকার আদায়ে তিনি এখানে জোরালো বক্তব্য রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই দিন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক একটি বিশেষ পার্শ্ব-বৈঠকে (সাইড ইভেন্ট) অংশগ্রহণ করবেন।
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে বাংলাদেশ যে অমানবিক চাপের মুখে রয়েছে, তা তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে তুলে ধরবেন।
রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে সম্মানজনক ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর, দৃশ্যমান ও শক্তিশালী সহযোগিতা আহ্বান করবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করবেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তিনি এই বৈশ্বিক মঞ্চে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরবেন। বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়ন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজন, উন্নত দেশগুলো থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) এবং সর্বোপরি জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করবেন।
এই দিনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি থাকবে তার এই ভাষণের দিকে, যেখানে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং বৈশ্বিক সংকটগুলোতে দেশের অবস্থান স্পষ্ট করবেন।
এছাড়া, একই দিন তিনি মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি (ধাত্রীবিদ্যা) বিষয়ক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের নতুন ও যুগান্তকারী উদ্যোগ, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ ও পেশাদার প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ আলোকপাত করবেন।
জাতিসংঘের এই বহুমাত্রিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন। এর মধ্যে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার একক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, টেকসই উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকের সূচি নির্ধারিত রয়েছে। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর), জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করবেন।
এই বৈঠকগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে তিনি বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু ওয়াল স্ট্রিটসহ বেশ কয়েকটি বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করবেন।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, উৎপাদন শিল্প, উদীয়মান অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতের অপার সম্ভাবনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হবে।
জাতিসংঘের এই অত্যন্ত ব্যস্ত, ফলপ্রসূ এবং ঐতিহাসিক সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে করে নিউইয়র্ক থেকে স্বদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে তার এই সফর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।