সারা বিশ্বে চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং পরিবহন খাতকে সচল রাখার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার গণপরিবহনের যাত্রীভাড়া পুনর্নির্ধারণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
দেশজুড়ে চলাচলকারী ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি করে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সহকারী সচিব মো. জসিম উদ্দিন এই প্রজ্ঞাপনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন।
এর মধ্য দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে পরিবহন মালিক এবং সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে চলমান সকল জল্পনাকল্পনা ও অনিশ্চয়তার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। দেশের আপামর জনসাধারণের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরিবহন খাতকে সচল রাখা এবং পরিবহন মালিকদের ব্যাপক ব্যবসায়িক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সরকারের তরফ থেকে এই সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
নতুন জারি করা এই প্রজ্ঞাপনে গণপরিবহনের ভাড়ার একটি সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এই নতুন রূপরেখা অনুযায়ী, দেশের প্রধান দুই বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বিশাল ও ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যার দৈনন্দিন যাতায়াতের সবচেয়ে বড় এবং সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয় এই সিটি সার্ভিস বাসগুলো। অন্যদিকে, আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রেও ভাড়ার হার যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন থেকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াতকারী দূরপাল্লার পরিবহনগুলোর ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া হবে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪০ পয়সা। এর ফলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং চাকরিজীবীদের ভ্রমণ ব্যয় আগের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি এই সিদ্ধান্তে কিলোমিটারপ্রতি মাত্র ১৭ পয়সা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, দূরপাল্লার দীর্ঘ যাত্রায় সামগ্রিকভাবে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অংকের আর্থিক পার্থক্য তৈরি করবে, যা সাধারণ যাত্রীদের বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাজধানী সংলগ্ন অন্যান্য জনবহুল জেলাগুলোর গণপরিবহন ব্যবস্থাকেও এই নতুন প্রজ্ঞাপনের সুস্পষ্ট আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অধীনে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত জেলাগুলো-যেমন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর এবং মানিকগঞ্জের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়ার ক্ষেত্রেও নতুন হার কার্যকর হবে।
এই জেলাগুলোর অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী পরিবহনগুলোতে এখন থেকে প্রতি কিলোমিটার যাত্রার জন্য যাত্রীদের ২ টাকা ৬০ পয়সা হারে ভাড়া প্রদান করতে হবে। এই অঞ্চলগুলো মূলত দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন লাখ লাখ তৈরি পোশাক শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ এসব গণপরিবহন ব্যবহার করে নিজেদের কর্মস্থলে যাতায়াত করে থাকেন।
তাদের প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ এই নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সরাসরি প্রভাবিত হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তটি মূলত আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং যাত্রীদের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় রাখার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে।
ভাড়া বৃদ্ধির এই সামগ্রিক ঘোষণায় সাধারণ যাত্রীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবরও সযত্নে রাখা হয়েছে, যা সরকারের জনকল্যাণমুখী চিন্তার পরিচায়ক। প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়ার হার আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকবে।
অর্থাৎ, মহানগরীতে বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একজন যাত্রীকে সর্বনিম্ন ১০ টাকা এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮ টাকা ভাড়া প্রদান করতে হবে, যা পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার সমান। স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তটি আর্থিকভাবে বেশ স্বস্তিদায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি প্রজ্ঞাপনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এই বর্ধিত ভাড়া কেবল মাত্র সেই সব বাস এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যেগুলো সম্পূর্ণভাবে ডিজেল জ্বালানি দ্বারা চালিত হয়।
যেসব গণপরিবহন সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজিচালিত, তাদের ক্ষেত্রে এই নতুন ভাড়াবৃদ্ধির হার কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। গ্যাসচালিত পরিবহনগুলোকে পূর্বের নির্ধারিত ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন অব্যাহত রাখতে হবে।
যাত্রীদের আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গণপরিবহনের ভেতরের আসন ব্যবস্থায় প্রায়শই কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়ে থাকে। এই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপনে আসন পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
অনেক সময় পরিবহন মালিকরা যাত্রীদের অধিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর অনুমোদিত আসন সংখ্যা কমিয়ে বাসের ভেতরের পরিসর বৃদ্ধি করে থাকেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো বাস বা মিনিবাসের আসন সংখ্যা উন্নত সেবার স্বার্থে এইভাবে কমানো হয়, তবে নির্ধারিত ভাড়া আনুপাতিক হারে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তবে এই পুনর্নির্ধারণ পরিবহন মালিকরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো করতে পারবেন না। এর জন্য অবশ্যই রুট পারমিট অনুমোদনকারী বৈধ কর্তৃপক্ষ অথবা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কাছ থেকে ওই আনুপাতিক বর্ধিত ভাড়ার হার আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।
এই নিয়মের ফলে উন্নত সেবার নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ভাড়া আদায়ের অন্যায্য প্রবণতা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। গণপরিবহনে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডা এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি একটি নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং ভাড়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রজ্ঞাপনে কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের ভেতরে যাত্রীদের সহজে চোখে পড়ে এমন একটি দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
কোনো পরিবহন মালিক বা শ্রমিক যদি সরকারের এই নির্দেশ অমান্য করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরপরই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পক্ষ থেকে সিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছিল।
কিন্তু সরকার দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ যাত্রীদের আর্থিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে উভয় ক্ষেত্রেই ভাড়ার বৃদ্ধি কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সায় সীমাবদ্ধ রেখেছে।
একই সঙ্গে নতুন এই ভাড়ার তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে গণপরিবহনের ভাড়া সংক্রান্ত আগের সব প্রজ্ঞাপন ও সরকারি আদেশ বাতিল করে রহিত ঘোষণা করা হয়েছে। পরিশেষে এটি অনুধাবন করা যায় যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে স্থানীয় পরিবহন খাতে ভাড়ার সমন্বয় একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতারই অংশ।
তবে গণপরিবহনের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ভাড়ার সামান্য পরিবর্তনও দেশের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের হিসাবনিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয়ের ওপর একটি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সরকারের এই নতুন নীতিমালাটি পরিবহন খাতকে স্থবিরতার হাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের ওপর আর্থিক চাপের একটি ভারসাম্যমূলক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছে। এখন সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং তদারককারী কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজপথে এই নীতিমালার কঠোর ও সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
সাধারণ যাত্রীরা যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন এবং গ্যাসচালিত যানের যাত্রীদের কাছ থেকে যেন অন্যায়ভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করা না হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের নিবিড় নজরদারি ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।