বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইউপি নির্বাচনে বিধিমালার বড় সংস্কার

বাড়ল জামানত ও ব্যয়সীমা, সমান ভোটে পুনরায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

বাড়ল জামানত ও ব্যয়সীমা, সমান ভোটে পুনরায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রাচীন এবং তৃণমূল পর্যায়ের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবসময়ই সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূলের এই নির্বাচনকে আরও বেশি স্বচ্ছ, যুগোপযোগী এবং কার্যকর করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন এক ব্যাপক আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করেছে।

 

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার বিভিন্ন ধারা সংশোধন করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় একটি নতুন গেজেট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, প্রকাশিত এই সংশোধিত গেজেটের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানত বৃদ্ধি, নির্বাচনি ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট আর্থিক রূপরেখা প্রণয়ন, প্রার্থীদের সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ এবং নির্বাচনি অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর পরিবর্তন আনা হয়েছে।

 

দীর্ঘদিনের নির্বাচনি চর্চায় আধুনিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগ দেশের স্থানীয় সরকারের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে নীতি নির্ধারক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

নির্বাচন কমিশনের নতুন এই বিধিমালার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের একটি হলো প্রার্থীদের জামানতের অর্থ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে পঁচিশ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

একইভাবে সাধারণ সদস্য পদপ্রার্থীদের ক্ষেত্রেও জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। অতীতে নামমাত্র জামানত থাকায় অনেক সময়ই অযোগ্য বা অনীহ ব্যক্তিরা প্রার্থিতা ঘোষণা করতেন, যা নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করত।

 

তবে কেবল জামানতের অর্থ বাড়ানোই নয়, বরং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে জামানত বাজেয়াপ্তের নিয়মেও কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে, কোনো প্রার্থী যদি তার নির্বাচনি এলাকায় প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের অন্তত পনেরো শতাংশ অর্জন করতে ব্যর্থ হন, তবে তার জমা দেওয়া সম্পূর্ণ জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।

 

এই কঠোর নিয়মের ফলে কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উৎসাহিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রমের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা পুনর্নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

 

নতুন গেজেট অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তার সম্পূর্ণ নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত বৈধভাবে ব্যয় করতে পারবেন। অন্যদিকে, সাধারণ সদস্য পদের প্রার্থীরা তাদের প্রচারণায় সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করার সুযোগ পাবেন।

 

নির্বাচনি রাজনীতিতে কালো টাকার অবৈধ প্রভাব ও পেশিশক্তির দাপট বন্ধ করতে এই ব্যয়ের হিসাব নিবিড়ভাবে তদারকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কমিশন স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে, প্রার্থী কিংবা তার মনোনীত নির্বাচনি এজেন্টকে সকল প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক ব্যয় পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট তফসিলি ব্যাংকে পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে।

 

নির্বাচনি প্রচারণার সময় কুড়ি হাজার টাকার বেশি যেকোনো ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং মাধ্যম ছাড়া নগদ অর্থে সম্পন্ন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আর্থিক নির্দেশনার ফলে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং আয়-ব্যয়ের অডিট করা কমিশনের পক্ষে অনেক বেশি সহজতর হবে।

 

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সততা, নৈতিকতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রার্থীদের তথ্যের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়মে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থী এবং তার ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে দেশে এবং বিদেশে থাকা যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ হলফনামা আকারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

অতীতে কেবল অভ্যন্তরীণ সম্পদের হিসাব দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, এবার প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটিতে থাকা সম্পদের যাবতীয় তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, প্রার্থী যে একজন নিয়মিত এবং দায়িত্বশীল করদাতা, তা প্রমাণের জন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তার সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের আনুষ্ঠানিক প্রমাণপত্র দাখিল করাও আবশ্যক করা হয়েছে।

 

সম্পদ ও আয়ের তথ্যের এই বাধ্যতামূলক প্রকাশ তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক সততা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও ভয়ভীতিহীন নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শাস্তির বিধানে ব্যাপক কঠোরতা আনা হয়েছে।

 

কোনো প্রার্থী, তার সমর্থক কিংবা নির্বাচনি প্রচারণায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি সাধারণ ভোটারদের হুমকি প্রদান করেন, ভয়ভীতি দেখান কিংবা পেশিশক্তি প্রদর্শনের মতো কোনো বেআইনি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তবে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বিধিমালায় এই ধরনের নির্বাচনি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করার পূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

 

নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর অবস্থান মূলত সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ভোটকেন্দ্রে তাদের নির্বিঘ্ন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সংশোধিত বিধিমালার সবচেয়ে আলোচিত, গণতান্ত্রিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি হলো প্রার্থীদের সমান ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের লটারির নিয়ম পুরোপুরি বাতিল করা।

 

ইতিপূর্বে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুজন বা ততোধিক প্রার্থী সমান সংখ্যক ভোট পেলে লটারির মতো আকস্মিক ও ভাগ্যনির্ভর পদ্ধতির মাধ্যমে জয়-পরাজয় বা বিজয়ী নির্ধারণ করা হতো। এই পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে এক ধরনের নৈতিক অসন্তোষ এবং গণতান্ত্রিক দুর্বলতার অভিযোগ ছিল।

 

কমিশন সেই বিতর্কিত বিধানটি সম্পূর্ণ বাতিল করেছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো পদে প্রার্থীরা সমান সংখ্যক ভোট পেলে আর কোনো অবস্থাতেই লটারির আশ্রয় নেওয়া হবে না। বরং যে কেন্দ্রগুলোতে বা নির্বাচনি এলাকায় ভোটের সমতা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ নতুন করে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা হবে।

 

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরেই কেবল বিজয়ী ঘোষণা করার এই নীতিটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনাকে বহুগুণে শক্তিশালী করবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালায় বিশেষভাবে সক্ষম ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অত্যন্ত মানবিক ও সুসংহত উপায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা দৃষ্টিহীনতার কারণে যারা একা একা ব্যালট পেপারে সিল মারতে বা ভোট দিতে অক্ষম, তারা যাতে অন্যের দ্বারা প্রতারিত না হন, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক অনুমতি সাপেক্ষে এমন ভোটাররা ভোটকক্ষে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেওয়ার জন্য অন্তত একুশ বছর বয়সী একজন বিশ্বস্ত সাহায্যকারীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

 

তবে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে এই সহায়তাকারীর যোগ্যতার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট ও অলঙ্ঘনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট, ভোটগ্রহণে নিয়োজিত কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য কোনো অবস্থাতেই এই সহায়তাকারী হতে পারবেন না।

 

একই সঙ্গে মনোনীত ওই সহায়তাকারীকে ভোটারের পছন্দের পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এই ধরনের বিশেষ সহায়তাপ্রাপ্ত সকল ভোটারের নাম ও বিবরণ দিয়ে একটি পৃথক আনুষ্ঠানিক তালিকা সংরক্ষণ করবেন।

 

এর ফলে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া ভোটারদের নাগরিক অধিকার যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও কোনো ধরনের সংশয় বা প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকবে না। সামগ্রিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার এই ব্যাপক সংস্কার কেবল নির্বাচনি নিয়মনীতির একটি আনুষ্ঠানিক আধুনিকায়ন নয়, বরং এটি তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক অনিয়ম রোধ এবং গণমানুষের ভোটাধিকারকে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।

 

এই নতুন বিধিমালা আগামী দিনগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোকে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর করে তুলতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করা যায়।