বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজী নজরুলের ২য় স্ত্রীর আত্মহত্যা: প্ররোচনা মামলায় মামা কারাগারে, তদন্তে নতুন মোড়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

গাজী নজরুলের ২য় স্ত্রীর আত্মহত্যা: প্ররোচনা মামলায় মামা কারাগারে, তদন্তে নতুন মোড়
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সংসদ সদস্যদের সরকারি বাসভবন ন্যাম ভবনে সংঘটিত একটি মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী, মাত্র উনিশ বছর বয়সী তরুণী মরিয়ম খাতুনের রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা প্ররোচনা মামলায় আইনি কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

 

এই স্পর্শকাতর মামলায় সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং নিহত তরুণীর আপন মামা ওবায়দুর রহমানকে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি বিচারিক আদালত।

 

একজন জনপ্রতিনিধির বাসভবনে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এবং এর পেছনে ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক কলহ ও অনৈতিক সম্পর্কের যে অভিযোগগুলো উঠে আসছে, তা সচেতন মহলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে নিহত তরুণীর পরিবার যেমন সোচ্চার, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আসামি ওবায়দুর রহমানকে আদালতে হাজির করে তাকে কারাগারে আটক রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আবেদন পেশ করেন।

 

বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীদের নিশ্চিত করেন যে, শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীর তরফ থেকে কোনো ধরনের জামিন আবেদন জমা দেওয়া হয়নি। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই বিচারক আসামিকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তা তার আবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তরুণী মরিয়ম খাতুনের এই মর্মান্তিক আত্মহত্যার পেছনে আসামি ওবায়দুরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনা থাকার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে বেশ কিছু জোরালো সাক্ষ্যপ্রমাণ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে এসেছে।

 

তদন্তের স্বার্থে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের লক্ষ্যে আসামিকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা অপরিহার্য বলে আদালতকে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তা এও জানিয়েছেন যে, মামলার গভীরতর রহস্য উন্মোচনের জন্য অদূর ভবিষ্যতে আসামিকে রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে।

 

এই বিয়োগান্তক ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২০ সেপ্টেম্বর, রোববার। সেদিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তার শ্বশুর, অর্থাৎ নিহত মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহকে মুঠোফোনে কল করে অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে তাদের ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন।

 

শেরেবাংলা নগর এলাকায় অবস্থিত সংসদ সদস্যদের আবাসস্থলের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যখন উদ্বিগ্ন বাবা মাসুম বিল্লাহ পৌঁছান, তখন তিনি সেখানে অনেক মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় দেখতে পান।

 

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি জানতে পারেন যে, ফ্ল্যাটের ভেতরের একটি আবদ্ধ কক্ষে তার আদরের মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল।

 

পুলিশের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ফ্ল্যাটের সেই নির্দিষ্ট কক্ষটির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার পর এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাবা মাসুম বিল্লাহ নিজ চোখে দেখতে পান সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তার মেয়ের নিথর দেহ ঝুলছে।

 

পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল তল্লাশি করে বিছানার ওপর থেকে নিহত তরুণীর স্বহস্তে লেখা একটি মৃত্যুপূর্ব চিঠি বা সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়, যা এই মামলার অন্যতম প্রধান আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সন্তান হারানোর তীব্র শোক ও ক্ষোভ নিয়ে নিহত মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই মামলায় সরাসরি প্রধান আসামি করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে।

 

পাশাপাশি এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং নিহত তরুণীর মামা ও এমপির গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকেও এই মামলায় যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

মামলার এজাহারে বাদী অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, গত জুন মাসে সম্পূর্ণ ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে তার তরুণী কন্যা মরিয়ম খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল।

 

এই অসম বিয়ের পেছনে আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও জোরালো প্ররোচনা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিয়ের পর সংসদ সদস্যের পদমর্যাদার কারণে মরিয়ম তার স্বামী এবং সতিন অর্থাৎ প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সঙ্গে ন্যাম ভবনের ওই অভিজাত ফ্ল্যাটেই বসবাস করতে শুরু করেন।

 

কিন্তু বিয়ের পর থেকেই মরিয়মের জীবনে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। মামলার বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে গোপনে মুঠোফোনের মাধ্যমে তার অসহায় পরিবারকে জানাতেন যে, স্বামী নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর বিষয় নিয়ে তার ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।

 

মাসের পর মাস ধরে চলা এই নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং আসামিদের লাগাতার প্ররোচনা সহ্য করতে না পেরেই শেষ পর্যন্ত মাত্র উনিশ বছর বয়সে আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হন মরিয়ম।

 

এই মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনার পেছনে একটি বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। গত জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে নিহত মরিয়ম খাতুনের কিছু অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও চিত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

একজন জনপ্রতিনিধির এমন অনৈতিক ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা এবং তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে নজরুলের অবস্থান চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জনরোষ এবং নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সামনে আসার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

 

গত ২২ জুলাই দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সাংগঠনিকভাবে নিবিড় তদন্ত পরিচালনা করে এবং নজরুলের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। ফলশ্রুতিতে, জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট প্রয়োগ ঘটিয়ে গাজী নজরুল ইসলামকে দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করে।

 

রাজনৈতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকেও এই বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি অবগত করে, যা নজরুলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

 

বর্তমান এই প্ররোচনা মামলার একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং জটিল দিক হলো আসামি ওবাদুর রহমান এবং সংসদ সদস্য নজরুলের মধ্যকার পূর্ববর্তী আইনি বৈরিতা। ভিডিও কেলেঙ্কারির ঘটনার পরপরই তাদের মধ্যকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল।

 

গত ২১ জুলাই ওবায়দুর রহমান নিজেই বাদী হয়ে পল্লবী থানায় সংসদ সদস্য নজরুলের বিরুদ্ধে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেছিলেন। ওই মামলায় ওবায়দুর অভিযোগ করেছিলেন যে, ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে এবং অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় এমপি নজরুল তাকে অমানুষিক মারধর করে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালান।

 

সেই হত্যাচেষ্টা মামলায় আইনি লড়াই চালিয়ে গত ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে আট সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন লাভে সক্ষম হন এমপি নজরুল। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, যেই ওবায়দুর রহমান কয়েক মাস আগে এমপির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনেছিলেন, আজ সেই ওবায়দুর রহমানই নিজের আপন ভাগ্নির আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় সেই একই এমপির সঙ্গে সহ-আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন।

 

আইনের এই জটিল সমীকরণ এবং সম্পর্কের এই অদ্ভুত পালাবদল পুরো ঘটনাটিকে আরও বেশি রহস্যময় ও গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে। মাত্র উনিশ বছর বয়সী এক তরুণীর এমন অকাল ও মর্মান্তিক প্রয়াণ একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন চিত্রকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে।

 

একটি সাধারণ পরিবার থেকে আসা মরিয়ম খাতুন ক্ষমতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যেভাবে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

 

এখন পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর। গোয়েন্দা পুলিশ অত্যন্ত সাবলীল ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তকাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

উদ্ধারকৃত ফরেনসিক প্রমাণাদি, ডিজিটাল তথ্য এবং আসামিদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই অচিরেই এই আত্মহত্যার পেছনের প্রকৃত সত্য ও মূল অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে প্রত্যাশা করছেন।

 

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতার দম্ভে আর কোনো নিষ্পাপ প্রাণকে এভাবে অকালে ঝরে পড়তে না হয়।