বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্যোগ সহনশীলতায় বিশ্বে দ্রুততম অগ্রগতি অর্জন করেছে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

দুর্যোগ সহনশীলতায় বিশ্বে দ্রুততম অগ্রগতি অর্জন করেছে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল
ছবি : আনাদোলু

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা বিপর্যয়ের মুখে টিকে থাকা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আফ্রিকার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাচ্ছে। ২০২৩ সালের পর থেকে মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতায় বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে আফ্রিকা মহাদেশে সবচেয়ে দ্রুত উন্নতি দৃশ্যমান হয়েছে।

 

বিশ্বজুড়ে পরিচালিত এক বিশদ গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ বৈশ্বিক ঝুঁকি জরিপ বা ওয়ার্ল্ড রিস্ক পোল প্রতিবেদনে এই আশাব্যঞ্জক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই উন্নতির পাশাপাশি সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক স্তরে বড় ধরনের বৈষম্য ও ব্যর্থতার চিত্রও সামনে এসেছে।

 

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগকবলিত প্রায় বাইশ কোটি মানুষ আঘাত হানার আগে কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা পাননি, যা আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

 

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সহনশীলতা বৃদ্ধির সূচকে উত্তর আফ্রিকা সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করেছে। এই অঞ্চলে সহনশীলতার সামগ্রিক মান পাঁচ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ।

 

এর পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে চার পয়েন্ট উন্নতি রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া পূর্ব আফ্রিকা এবং মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোতেও গড়ে তিন পয়েন্ট করে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

 

বিশেষ করে আলজেরিয়া, মিসর, কেনিয়া, নাইজেরিয়া এবং উগান্ডার মতো রাষ্ট্রগুলোতে ইন্টারনেট পরিষেবার ক্রমবর্ধমান বিস্তার, পারিবারিক পর্যায়ের সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার এবং আর্থিক সক্ষমতার উন্নতির কারণে এই গতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

 

গবেষকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই অগ্রগতির অর্থ এই নয় যে আফ্রিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বা সহনশীল মহাদেশ হয়ে উঠেছে। বরং এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো, পর্যালোচিত নির্দিষ্ট সময়সীমায় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় সবচেয়ে দ্রুতগতিতে নিজেদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠছে।

 

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালপ এই চতুর্থ সংস্করণের বৈশ্বিক ঝুঁকি জরিপটি সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরিচালনা করে। ২০২৫ সালে পরিচালিত এই বিশদ সমীক্ষায় বিশ্বের একশত চল্লিশটি দেশ ও অঞ্চলের এক লাখ তেতাল্লিশ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতামত ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

 

জরিপের সহনশীলতা সূচকে যেকোনো বড় আঘাত বা দুর্যোগ সহ্য করার এবং পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সক্ষমতাকে শূন্য থেকে একশত এর স্কেলে পরিমাপ করা হয়েছে। এই মূল্যায়নে ব্যক্তিগত মানসিক দৃঢ়তা, পারিবারিক পূর্বপ্রস্তুতি, সংকটকালে স্থানীয় সামাজিক বা পারস্পরিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর সামগ্রিক পরিবেশকে সমানভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

 

আফ্রিকার এমন ইতিবাচক অগ্রগতির মাঝেও দুর্যোগ সংক্রান্ত সতর্কবার্তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মারাত্মক আঞ্চলিক ও আর্থসামাজিক বৈষম্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় দুর্যোগের মুখে পড়া প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম, অর্থাৎ মাত্র সাতচল্লিশ শতাংশ মানুষ কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছেন।

 

বাকি তিপ্পান্ন শতাংশ মানুষ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সরাসরি দুর্যোগের কবলে পড়েছেন। বিশ্বব্যাপী এই পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। জরিপের পূর্ববর্তী পাঁচ বছরে বিশ্বের প্রায় একশত দশ কোটি মানুষ কোনো না কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছেন।

 

এর মধ্যে প্রায় বাইশ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে দুর্যোগের পূর্ব মুহূর্তে কোনো সতর্কবার্তাই পৌঁছায়নি, যা প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে যে, সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য মানুষের দুর্যোগের ঝুঁকির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

 

উচ্চ আয়ের বা ধনী দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন আয়ের দরিদ্র দেশগুলোর নাগরিকদের দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ। তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রতি তিনজনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার মাত্র ষোল শতাংশ।

 

সতর্কবার্তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই শ্রেণিবৈষম্য স্পষ্ট। দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্যোগের শিকার হওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র চৌষট্টি শতাংশ সতর্কবার্তা পেয়েছেন। অন্যদিকে ধনী দেশগুলোতে এই হার ছিল চুরাশি শতাংশ।

 

কেবল আগাম বার্তা পাওয়াই জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং সেই সংকেত পাওয়ার পর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বাস্তব সামর্থ্য থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

 

নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সতর্কবার্তা পাওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম মানুষ দুর্যোগ আঘাত হানার আগে আত্মরক্ষামূলক বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পেরেছেন। এর বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হার ছিল একাত্তর শতাংশ।

 

সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অভাব, আর্থিক দৈন্য এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতাই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সতর্কবার্তা পৌঁছানোর এই বিশাল শূন্যতা দূর করার ক্ষেত্রে আধুনিক মুঠোফোনকে এক অনন্য ও সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে গবেষণা প্রতিবেদনটি।

 

জরিপে দেখা গেছে, দুর্যোগের আগে কোনো ধরনের সতর্কবার্তা পাননি এমন মানুষের সাতাত্তর শতাংশের হাতেই সচল মুঠোফোন ছিল। অর্থাৎ প্রায় সতেরো কোটি মানুষ শুধু সঠিক প্রচার ও বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে নিজেদের হাতের কাছে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সতর্কবার্তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

 

এছাড়া গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে। যেকোনো একটি একক মাধ্যমের চেয়ে একাধিক ভিন্ন উৎসের মাধ্যমে যখন মানুষের কাছে বিপদসংকেত পৌঁছেছে, তখন তাদের সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

যারা কেবল একটি একক মাধ্যমে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র সাঁইত্রিশ শতাংশ মানুষ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। যখন দুটি পৃথক মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছেছে, তখন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে একান্ন শতাংশে।

 

আর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন উৎসের মাধ্যমে সংকেত পাওয়ার ক্ষেত্রে চুষট্টি শতাংশ মানুষ আত্মরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এই মাধ্যমগুলোর মধ্যে মুঠোফোনের লিখিত বার্তা, টেলিভিশন সম্প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বেতার এবং স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগ অন্যতম।

 

সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এবং সামাজিক সহনশীলতার বৈশ্বিক গড় মান ২০২১ সালের তেষট্টি পয়েন্ট থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে রেকর্ড ছেষট্টি পয়েন্টে পৌঁছেছে।

 

তবে এর বিপরীতে ব্যক্তিগত পর্যায়ের সহনশীলতার ক্ষেত্রে এক উদ্বেগজনক পতন লক্ষ্য করা গেছে। সূচকে ব্যক্তিগত সহনশীলতার মান ছেচল্লিশ থেকে নেমে বিয়াল্লিশ পয়েন্টে এসে ঠেকেছে, যা এই সূচকের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন স্তর।

 

পরিশেষে গবেষণা সংস্থাটি জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে যে, শুধু প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে সতর্কবার্তার আওতা বাড়ানোই চূড়ান্ত সমাধান নয়। প্রান্তিক মানুষকে দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে হলে পরিবারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক সাড়াদানের দক্ষতায় সমন্বিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

আগাম তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি মানুষের যাতে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সময়, নিরাপদ আশ্রয় এবং আর্থিক সক্ষমতা থাকে, তা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্যোগের সামগ্রিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে না।

 

- আনাদোলু এজেন্সি