আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ গত আগস্টেই সতর্ক করেছিল যে, তহবিলের ব্যাপক ঘাটতি সোমালিয়ার স্বাস্থ্যসেবাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, মার্কিন সহায়তা স্থগিত হওয়ার কারণে রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের বাইদোয়া অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ৩৭টি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও মায়েরা অত্যাবশ্যকীয় প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাবের হামলা কিছুটা কমেছে এবং প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের ‘টোটাল ওয়ার’ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ কৌশল সামরিক ক্ষেত্রে প্রশংসিত হচ্ছে, তবুও এর একটি নেতিবাচক দিক রয়েছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সাফল্যের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ‘সোমালি পাবলিক এজেন্ডা’ নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মাহাদ ওয়াসুগের মতে, সরকারের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে নিরাপত্তা খাতে।
ফলে স্বাস্থ্যখাতের মতো মৌলিক সেবাগুলো সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার নিচে পড়ে গেছে এবং পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে ধুঁকছে। মোগাদিসুর প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র অত্যন্ত করুণ। চীনা সহায়তায় নির্মিত বেনারদির হাসপাতাল এবং এক শতাব্দী আগে ইতালীয় ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত ডি মার্টিনো হাসপাতাল-উভয়ই বিদেশি সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বেনারদির হাসপাতালে অপুষ্ট শিশুদের চিকিৎসার ইউনিটটি সম্পূর্ণভাবে দাতা সংস্থা ‘কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড’-এর অর্থায়নে চলে।
মার্কিন অনুদান বন্ধ হওয়ায় সেখানে ইতিমধ্যেই ৩৭ জন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, বর্তমানে মাত্র ১৩ জন কর্মী নিয়ে কোনোমতে চলছে এই ইউনিটের কার্যক্রম। অন্যদিকে, ডি মার্টিনো হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দিরাহিম ওমর আমিন জানান, হাসপাতালের ল্যাবরেটরির প্রায় সব যন্ত্রপাতিই দাতাদের অনুদানে কেনা। আগামী বছর মানবিক সংস্থাগুলোর সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি কী ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে তিনি গভীর শঙ্কায় রয়েছেন। বর্তমানে মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সহায়তা প্রদান করছে।
সোমালিয়ার এই সংকটের মূল শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক সিয়াদ বারের পতনের পর দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে দেশটির অধিকাংশ সরকারি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশটির এমপি মোহাম্মদ আদম দিনির মতে, কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা না থাকায় এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মহামারি ও রোগবালাই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এতসব সংকটের মধ্যেও দরিদ্র মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপরই ভরসা করছেন।
আমিনা আব্দুলকাদির মোহামেদ নামের এক কর্মহীন মা জানান, কেবল বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসার আশাতেই তিনি ডি মার্টিনো হাসপাতালে সন্তান প্রসবের জন্য এসেছেন। দাতা সংস্থাগুলোর বিমুখতা এবং বিদেশি তহবিল কমে যাওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-শুধু ভূখণ্ড রক্ষা করলেই কি চলবে, নাকি এই ভঙ্গুর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবন বাঁচানোও জরুরি?