রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অভিবাসন কমলেও বাড়ছে সাগরে প্রাণহানির ঝুঁকি ও মানবিক সংকট

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ০২:৫৯ পিএম

অভিবাসন কমলেও বাড়ছে সাগরে প্রাণহানির ঝুঁকি ও মানবিক সংকট
ছবি: AP

আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখা অভিবাসীদের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট মৌরিতানিয়া। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক চুক্তির ফলে এই রুটে অভিবাসীদের সংখ্যা দৃশ্যত কমেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জনজীবনে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।

 

উত্তর মৌরিতানিয়ায় অভিবাসী শিশুদের জন্য বিশেষভাবে পরিচালিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদ মোলুহ জানান, এ বছর তার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি ফাঁকা। তার মতে, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব চুক্তির কঠোর বাস্তবায়নের ফলেই এমনটা ঘটছে।

 

তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। অনেক পরিবারকে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বা ডিপোর্ট করা হয়েছে, ফলে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।" মৌরিতানিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই ১৮ হাজারেরও বেশি অভিবাসীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার অভিবাসী মৌরিতানিয়া হয়ে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের মোট সংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশি।

 

পরিসংখ্যানের এই নিম্নমুখী গ্রাফ ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য স্বস্তির কারণ হলেও, গবেষকরা একে দেখছেন গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে। তাদের মতে, কড়াকড়ির কারণে অভিবাসীরা এখন ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য আরও দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে, যা প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল ও গাম্বিয়ার মতো দেশগুলো থেকে অভিবাসীরা ছোট ছোট কাঠের মাছ ধরার নৌকায় চড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগরে এই যাত্রা প্রায়শই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। গত আগস্ট মাসেই এমহেইজরাত গ্রামের উপকূলের কাছে এমন একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে, যেখানে প্রায় ১৬০ জন যাত্রী প্রাণ হারান।

 

স্থানীয় জেলে সাম্বা সও জানান, সেই রঙিন নৌকাটি এখনও সৈকতে পড়ে আছে, যা এক ভয়াবহ স্মৃতি বহন করছে। তিনি বলেন, "সমুদ্র ছিল উত্তাল, বাতাস ছিল তীব্র। তারা সবাই মারা গেছে, একজনও বাঁচেনি। শতাধিক লাশ এখানে পড়ে ছিল। প্রতিটি জীবনই অমূল্য, অথচ এভাবে তাদের চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"

 

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত সুরক্ষা এবং মানব পাচার মোকাবিলার জন্য মৌরিতানিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ২৪০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা পেয়েছে। তবে সাহিদ মোলুহের মতো স্থানীয়রা মনে করেন, কেবল বলপ্রয়োগ বা ডিপোর্টেশন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তিনি ভবিষ্যতের জন্য সরকারের কাছে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যাশা করেন।

 

তার কথায়, "তাদের জোর করে বের করে না দিয়ে একটি সুষ্ঠু সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। অনেক অভিভাবক আছেন যারা এখানে বৈধভাবে কাজ করতে চান। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া এত জটিল যে তা তাদের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয় না।" প্রকৃতপক্ষে, অভিবাসন কমার পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের স্বপ্নভঙ্গ আর সাগরে সলিল সমাধির করুণ উপাখ্যান।

 

- Africa News