প্রশাসনের কড়াকড়ি আর জীবনের ঝুঁকি-উভয়কেই উপেক্ষা করে তারা স্থানীয় জনপদকে সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সিপ্রিয়াল (ছদ্মনাম) নামের এক খনিশ্রমিক জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুর হাতছানি থাকে। তিনি বলেন, “যখন ভেতরে প্রবেশ করি, তখন জানি মাথার ওপরের পাথর যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে, যা আমার প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু পেটের দায়ে সব ভয় দূরে ঠেলে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।”
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কয়লা উৎপাদনকারী দেশ এবং দেশটির বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই কয়লা থেকে। অথচ যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সম্পদ আহরণ করছেন, তাদের জীবনই আজ অনিশ্চয়তার মুখে। সরকার এবং প্রশাসন এদের ‘অবৈধ খনিশ্রমিক’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও, শ্রমিকরা নিজেদের ‘কারিগর’ বা ‘আর্টিজানাল মাইনার’ হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
এরমেলোর খনিশ্রমিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জবুলানি সিবিয়া যুক্তি দেন যে, তাদের কাজ অননুমোদিত হলেও স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তা অপরিহার্য। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের সামর্থ্য এই অঞ্চলের অনেকেরই নেই। আমরা যে কয়লা উত্তোলন করি, তা দিয়েই সাধারণ মানুষ রান্না করে এবং শীতে ঘর গরম রাখে।” তবে প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এই শ্রমিকদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং এই কার্যক্রম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক কয়লা খাতে লক্ষাধিক মানুষ কাজ করলেও, ২০২১ সালের হিসাবমতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ খনির সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় দক্ষিণ আফ্রিকাও পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। বিশ্বের ১২তম বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে দেশটি ধনী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের ‘জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ’ (জেইটিপি) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
কিন্তু এরমেলো শহরের স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, সরকারিভাবে পরিচালিত এই সবুজ শক্তির বিপ্লবে তারা আবারও বঞ্চিত হবেন এবং কর্মসংস্থান হারাবেন। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব আর্টিজানাল মাইনার্স-এর মুখপাত্র জেথু হ্লাতশওয়ায়ো মনে করেন, একটি ‘ন্যায়সংগত রূপান্তর’ বা জাস্ট ট্রানজিশন তখনই সফল হবে, যখন ধ্বংসাত্মক বড় খনির পরিবর্তে টেকসই ও ক্ষুদ্র পরিসরের খনি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তারা একটি সামষ্টিক খনি অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন, যদিও সেই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ধীরগতির। শ্রমিকনেতাদের মতে, কয়লার যুগ শেষ হলেও সৌর প্যানেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য খনিজ উত্তোলনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই দক্ষ শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। হ্লাতশওয়ায়োর ভাষায়, “আমাদের মানুষকে পেছনে ফেলে কোনো রূপান্তরই ন্যায়সংগত হতে পারে না।”