এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ও প্রখ্যাত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেননি ট্রাম্প। উল্টো তিনি বিজয়ী নাভি পিল্লাইয়ের পরিচিতি ও যোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই ধরনের একটি পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নরওয়ের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন প্রকাশ্য ক্ষোভ এবং পুরস্কারের যৌক্তিক দাবি নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিরাকিউজে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়ে খোলামেলাভাবে তার বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাইকে একজন ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং মন্তব্য করেন যে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় পিল্লাইয়ের কোনো উল্লেখযোগ্য অবদানের কথা তার আদৌ জানা নেই।
একই সঙ্গে নরওয়েকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, তাকে এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই ভুলে যাবে না। শুধু সমাবেশেই নয়, নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালেও ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
সেখানে একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেন যে, তার শাসনামলে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বিশ্বের আটটি ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন এবং আরও অন্তত দুটি জটিল সংঘাত সমাধানের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে তার প্রশাসন যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে তিনি যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেসব কথাও অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের মতে, এতসব যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ এবং সফলভাবে তা বাস্তবায়নের পরও তাকে বা যুক্তরাষ্ট্রকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং চরম অন্যায্য।
তিনি ভেনেজুয়েলার চলমান সংকট নিরসনেও নিজের অভাবনীয় সাফল্যের দাবি করেছেন। ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, তিনি দেশটির একজন স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী নেতাকে আটক করতে সক্ষম হয়েছেন, যা ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে ভিন্ন কথা।
ট্রাম্পের দাবি করা আটটি সংঘাত অবসানের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোপুরি মিল পাওয়া যায় না। বেশ কয়েকটি সংঘাতের প্রকৃত অবসান নিয়ে এখনও গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কেবল একটি দেশ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশ, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থারও সম্মিলিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, যা ট্রাম্প তার দাবিতে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন।
প্রায় দশ মিনিটের এক দীর্ঘ বক্তব্যে ট্রাম্প বারবার জোরালোভাবে দাবি করেন যে, এই নোবেল শান্তি পুরস্কারটি একমাত্র তারই প্রাপ্য ছিল। তাকে এই স্বীকৃতি না দিয়ে নরওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা মূলত নিজেদের জন্যই একটি চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।
অবশ্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রতি ট্রাম্পের এই প্রবল আকাঙ্ক্ষা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও বহুবার তিনি নিজেকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার হিসেবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এমনকি পুরস্কার পাওয়ার আশায় নরওয়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নরওয়ের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানোর ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। তবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস এই বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নোবেল কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান।
তারা পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে নরওয়ে সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের নির্দেশ বা প্রভাব গ্রহণ করে না। আলফ্রেড নোবেলের উইলে যে সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তা কঠোরভাবে অনুসরণ করেই যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মানিত করা হয়।
ট্রাম্পের অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য না করলেও ফ্রাইডনেস বলেছেন, যারা অসীম সাহস ও সততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নিরলস অবদান রাখেন, মূলত তাদের স্বীকৃতি দেওয়াই এই শান্তি পুরস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য।
চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন প্রথিতযশা আইনজ্ঞ এবং জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার দীর্ঘদিনের অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য এবং বৈচিত্র্যময়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নির্যাতিত কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে তার এই সুদীর্ঘ সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৪ সালে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালেও তিনি অত্যন্ত সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একজন সম্মানিত বিচারক হিসেবেও নিজের দক্ষতার অসামান্য প্রমাণ রেখেছেন।
গত বছর ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের গঠিত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পিল্লাই। তার নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
যদিও ইসরায়েল সরকার বরাবরের মতোই এই গুরুতর অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান একটি ঐতিহাসিক মামলায় পিল্লাই বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর শোনার পর এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নাভি পিল্লাই স্বভাবসুলভ রসিকতা করে বলেন যে, উপস্থিত দর্শকরা যদি আরও বেশি করে করতালি দেন, তবে হয়তো তিনি তার এই মহামূল্যবান পুরস্কারটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি হবেন।
তবে পরক্ষণেই তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধের শিকার হওয়া অগণিত অসহায় মানুষের উদ্দেশে তার এই সম্মানজনক পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন। তার সাহসিকতার জন্য বিশ্বজুড়ে যে প্রশংসা করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে পিল্লাই প্রশ্ন তোলেন, সত্য কথা বলার জন্য আলাদা করে কেন সাহসের প্রয়োজন হবে?
এটি তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হওয়া উচিত। এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন নেতিবাচক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, এ ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ বৈশ্বিক পরিসরে আন্তর্জাতিক অপরাধের নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।
ঘটনাচক্রে, নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপের সাফাই গেয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক এই আদালত এমন কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছে, আর সেই হুমকি মোকাবিলা করতেই এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলো মনে করেন, যেদিন নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হলো, ঠিক সেই দিনেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার অপরিহার্য গুরুত্বকে আরও বেশি করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
গেরলোর মতে, নোবেল কমিটির এই সাহসী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন এবং এ আইন রক্ষাকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয়তা কতটা অপরিসীম, তা নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সাহসী, তবে এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আসা এই আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া বিশ্ববাসীর জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
এদিকে, ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি দেশ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি জোরালো প্রচার চালিয়েছেন। গত বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ভেনেজুয়েলার প্রখ্যাত বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নিজের পদকটি ট্রাম্পকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ভেনেজুয়েলার কর্তৃত্ববাদী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল। তবে নোবেল কমিটির কঠোর ও অপরিবর্তনশীল নিয়ম অনুযায়ী, একবার কোনো ব্যক্তির নামে পুরস্কার ঘোষণা করা হলে তা বাতিল করা, অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করার কোনো ধরনের সুযোগ নেই।