শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তৃতীয় মেয়াদেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অধিকার আছে, ট্রাম্পের দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

তৃতীয় মেয়াদেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অধিকার আছে, ট্রাম্পের দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদকাল নিয়ে নতুন করে এক নজিরবিহীন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, তৃতীয় মেয়াদেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ‘অধিকার’ তার রয়েছে।

 

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির পুরোনো অভিযোগটি নতুন করে সামনে এনে তিনি এই অভাবনীয় দাবি তুলেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে।

 

কারণ, আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের মুখে সংবিধানের মূল কাঠামোর বাইরে গিয়ে ক্ষমতায় থাকার এমন প্রকাশ্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের নজির বিরল। এটি কেবল মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই উত্তপ্ত করছে না, বরং আমেরিকার গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

 

গত বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর রাতে আইওয়া অঙ্গরাজ্যের সু সিটিতে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অগণিত ও একনিষ্ঠ সমর্থকদের উদ্দেশে এই বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। জনসভায় উপস্থিত হাজারো সমর্থকের তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে তার নিশ্চিত বিজয় অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

 

তার অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের ফলাফলে ব্যাপক কারচুপি করেছিল এবং জনগণের প্রকৃত রায়কে হাইজ্যাক করেছিল। ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যেহেতু তিনি এর আগে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং তার একান্ত বিশ্বাস মতে প্রতিবারই তিনি জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়ে জয়ী হয়েছেন, তাই ডেমোক্র্যাটদের এই ভোট ‘জালিয়াতি’র কারণে রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়ানোর পূর্ণ অধিকার তার তৈরি হয়েছে।

 

তার এই বক্তব্য জনসভাস্থলে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনার সৃষ্টি করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র ও সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট টানা চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, ভবিষ্যতে ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার রোধ করতে এবং ক্ষমতার পালাবদলকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৫১ সালে এই সংশোধনীটি মার্কিন সংবিধানে স্থায়ীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল।

 

সু সিটির জনসভায় দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও সংবিধানের এই কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। তিনি ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তার পক্ষে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া আইনিভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

 

তা সত্ত্বেও, তিনি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হওয়ার কথা বলে মূলত নিজের কট্টর সমর্থকদের আবেগ, বঞ্চনাবোধ ও ক্ষোভকে সর্বদা জাগ্রত রাখার একটি সুনিপুণ কৌশল গ্রহণ করেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার এই অদম্য আকাঙ্ক্ষার কথা এবারই প্রথম শোনা যায়নি। এর আগেও তিনি একাধিকবার নানাভাবে এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংবিধান বিরোধী এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন।

 

গত বছর তার নিজস্ব বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক প্রচারণার অফিশিয়াল বিপণিবিতানগুলো থেকে ‘ট্রাম্প ২০২৮’ লেখা সংবলিত বিশেষ টুপি ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি শুরু হয়, যা সেই সময়েই মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

 

এমনকি গত জুলাই মাসে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই ওই ‘ট্রাম্প ২০২৮’ লেখা টুপি পরিধান করে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার এই ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তৃতীয় মেয়াদের বিষয়টি নিছক কোনো মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কথা বা তাৎক্ষণিক আবেগ নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক কৌশলের একটি সুচিন্তিত অংশ, যার মাধ্যমে তিনি তার অনুসারীদের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে রাখতে চান।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ও বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে তার রাজনৈতিক মিত্র এবং রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতারা বিষয়টিকে অত্যন্ত লঘু করে দেখার চেষ্টা করছেন।

 

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের বর্তমান স্পিকার মাইক জনসনসহ ট্রাম্পের অন্যান্য ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীরা গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, ট্রাম্প মূলত ডেমোক্র্যাটদের উত্ত্যক্ত করা বা রাজনৈতিকভাবে খোঁচা দেওয়ার জন্যই নিছক কৌতুক করে এসব কথা বলেছেন।

 

তাদের মতে, এটি ট্রাম্পের নিজস্ব রসবোধ ও রাজনৈতিক বিনোদনের একটি অংশ মাত্র, যাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার বা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ট্রাম্পের কট্টর বিরোধীরা এটিকে কোনোভাবেই নিছক কৌতুক বা সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে মানতে নারাজ।

 

তারা মনে করেন, এটি আমেরিকার সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং শাসনতন্ত্রের প্রতি একটি চরম প্রচ্ছন্ন হুমকি। বিরোধীদের গভীর আশঙ্কা, ট্রাম্প যদি রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পান, তবে তিনি সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার বাস্তব চেষ্টাও চালাতে পারেন।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বিতর্কিত মন্তব্যটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র আগামী নভেম্বরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য ব্যাপকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনটি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক লড়াই।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত তার এই ধরনের উসকানিমূলক, চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে নিবদ্ধ রাখতে চাইছেন।

 

একইসঙ্গে তিনি তার রক্ষণশীল এবং একনিষ্ঠ ভোটার ভিত্তিকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে একটি বিশাল জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

 

আইওয়ার ওই জনসভা থেকে তিনি তার সমর্থকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করেন এবং কংগ্রেসে তার রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রথম সারির বৈশ্বিক পরাশক্তি, যাকে আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম সূতিকাগার বলা হয়, সেখানে খোদ একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের মুখে তৃতীয় মেয়াদের কথা শোনা যাওয়াটা বিশ্ব রাজনীতির জন্যও একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা বহন করে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে অনেক কর্তৃত্ববাদী নেতা রয়েছেন যারা সংবিধান পরিবর্তন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেন, যাদের যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই গণতন্ত্রের সবক দিয়ে থাকে। আমেরিকার মতো দেশে যদি ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর এই ধরনের আলোচনা স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান এবং বক্তব্য মার্কিন সমাজকে আরও বেশি রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে সমাজের এক বিশাল অংশ অন্ধভাবে তার প্রতিটি কথাকে সমর্থন করছে এবং অন্য অংশ তার প্রতিটি পদক্ষেপকে মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য চূড়ান্ত অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচনা করছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনের অধিকার দাবি করার বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে একটি নতুন, অভাবনীয় এবং অত্যন্ত জটিল অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি আইনিভাবে কতটা বাস্তবায়নযোগ্য বা আদৌ সম্ভব কি না, তার চেয়েও অনেক বড় প্রশ্ন হলো এটি রাজনৈতিকভাবে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে।

 

ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির পুরোনো অভিযোগ এবং সেই অজুহাতে সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করার প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষা-এই দুটি ভিন্ন বিষয়কে অত্যন্ত সুকৌশলে একীভূত করে ট্রাম্প মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক চাল চেলেছেন।

 

নভেম্বরের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই হয়তো অনেকাংশে নির্ভর করবে ট্রাম্পের এই ধরনের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ভবিষ্যতে কতটা বাস্তব রূপ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে আপাতত এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, আইওয়ার সু সিটির জনসভায় দেওয়া তার এই বিস্ফোরক বক্তব্য আগামী বেশ কিছুদিন মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে এবং দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান রসদ হিসেবে কাজ করে যাবে।

 

- দ্য গার্ডিয়ান