রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রুশ গবেষণাগার কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

রুশ গবেষণাগার কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু
ছবি : AFP

রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্লেগ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক নারী কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিরসনে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

 

জাতিসংঘের এই শীর্ষ স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থাটি শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, রুশ ওই গবেষণাগার কর্মীর মৃত্যু ঠিক কী কারণে বা কোন ধরনের নিউমোনিয়ার কারণে ঘটেছে, তা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

 

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ঘটনার পর সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্লেগ রোগের কোনো সংক্রমণ বা প্রাদুর্ভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আশ্বস্ত করেছে যে, নিহত ওই কর্মী এবং তার সংস্পর্শে আসা অন্যান্য ব্যক্তিদের শরীরে বিপজ্জনক কোনো রোগজীবাণু বা প্যাথোজেনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

 

অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত তাদের প্রত্যেকের নিবিড় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্যাথলজিক্যাল নমুনার ফলাফল সম্পূর্ণরূপে নেতিবাচক এসেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের বিস্তারিত বিবৃতিতে আরও নিশ্চিত করেছে যে, নিহত কর্মীর সংস্পর্শে আসা অন্য কোনো ব্যক্তির শরীরে এখন পর্যন্ত প্লেগ বা গুরুতর নিউমোনিয়ার কোনো ন্যূনতম উপসর্গও দেখা যায়নি।

 

এর পাশাপাশি, ওই নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন কোনো অজানা বা মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সন্ধানও পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাশিয়ার সরবরাহ করা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যাদির ওপর ভিত্তি করে তারা এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পায়নি, যা থেকে মনে হতে পারে যে ওই অঞ্চলে এই রহস্যময় রোগের চলমান কোনো সংক্রমণ বা বিস্তার ঘটছে।

 

তবে সংস্থাটি একটি বিষয়ে নিজেদের গভীর উদ্বেগের কথা গোপন করেনি। তারা জানিয়েছে, এই পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ও রহস্যের জায়গাটি হলো, মারা যাওয়া ওই ল্যাবরেটরি কর্মীর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা নিশ্চিত রোগ নির্ণয় এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

 

আর ঠিক এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাঝে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। গত ২ অক্টোবর রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের একটি গবেষণাগারে অত্যন্ত গোপনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে ওই কর্মীর মৃত্যু হয়।

 

তার মৃত্যুর পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রায় দুইশত মানুষকে কঠোর কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থায় নিয়ে আসে। এই আকস্মিক ও বিশাল পরিসরের পদক্ষেপের ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক ভীতি, গুঞ্জন ও গুজবের সৃষ্টি হয়।

 

রুশ গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত ওই কর্মীর নাম দারিয়া শিপিলোভা। ২৮ বছর বয়সী এই প্রতিভাবান তরুণী রাশিয়ার সাইবেরিয়া এবং দূরপ্রাচ্য অঞ্চলের ইর্কুতস্ক অ্যান্টিপ্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান বা গবেষণাগার সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

 

এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্লেগসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক সংক্রামক ব্যাধি ও প্যাথোজেন নিয়ে উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। যেহেতু দারিয়া শিপিলোভা এমন একটি উচ্চ-নিরাপত্তা বিশিষ্ট ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, তাই তার আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই প্লেগের মতো ভয়াবহ মহামারির আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে।

 

প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি হয়তো নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, নিউমোনিক প্লেগ হলো ফুসফুসের একটি অত্যন্ত মারাত্মক, সংক্রামক ও প্রাণঘাতী সংক্রমণ, যা মূলত 'ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস' নামক এক ধরনের ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে।

 

এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত বন্য পরিবেশে থাকা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং তাদের শরীরে বসবাসকারী ফ্লি বা মাছির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর পর প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের গভর্নর প্রকাশ্যে এমন চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছিলেন যে, ওই নারী সম্ভবত প্লেগ রোগেই মারা গেছেন।

 

একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার এমন দায়িত্বহীন বা অনানুষ্ঠানিক মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও বেশি ঘোলাটে আকার ধারণ করে এবং দ্রুতই তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কাড়ে।

 

তবে রাশিয়ার স্বাস্থ্য বিষয়ক শীর্ষ নজরদারি সংস্থা রোসপোট্রেবনাদজোর পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, নিহত কর্মীর শরীরে 'অজানা কারণজনিত নিউমোনিয়া'-র উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল, যা প্লেগ নয়।

 

রাশিয়ার সরকারি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, নিহত ল্যাবরেটরি কর্মীকে তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার প্রতিষেধক বা টিকা যথাযথ আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনেই প্রদান করা হয়েছিল।

 

তার মৃত্যুর পর শরীরের বিভিন্ন নমুনা নিয়ে করা ব্যাপক ময়নাতদন্ত এবং উন্নত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় এমন কোনো বিপজ্জনক অণুজীব বা মাইক্রোঅরগানিজমের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি, যার সঙ্গে তার গবেষণাগারের কাজের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

 

রুশ বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্লেগের কোনো অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, নিহত দারিয়া শিপিলোভার সংস্পর্শে আসা প্রতিটি ব্যক্তির নিবিড় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত যাবতীয় বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

এর আগে, গত ৬ অক্টোবর একজন স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন যে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যে দুইশত মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষকে ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের অবস্থাও স্থিতিশীল।

 

তবে এই রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনার জল এখানেই ঘোলার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস গত বুধবার রাশিয়ার কাছে একটি বিশেষ ও জরুরি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ওই একই গবেষণাগারের দ্বিতীয় আরেকজন কর্মীও অজানা কারণজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

 

ড. তেদ্রোস এই প্রতিবেদনের সত্যতা সম্পর্কে রাশিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব চেয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এই ধরনের খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও 'ভুয়া তথ্য' বলে দৃঢ়ভাবে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করেছে যে, দ্বিতীয় কোনো কর্মীর আক্রান্ত হওয়ার খবরটি নিছকই অপপ্রচার এবং এর কোনো বাস্তব বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

 

কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই ঘটনার পর রাশিয়ার কাছে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের স্পর্শকাতর বায়ো-ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগারে ঘটে যাওয়া যেকোনো দুর্ঘটনার সঠিক, নিরপেক্ষ ও উন্মুক্ত তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে পশ্চিমা বিশ্ব।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে, অজানা কারণজনিত যেকোনো শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অত্যন্ত সতর্ক ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করে আসছেন।

 

উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় ডেকে আনা কোভিড-১৯ মহামারির সূচনাও হয়েছিল চীনের উহান শহরের একটি অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অজানা ও মারাত্মক এক শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা বা নিউমোনিয়ার ক্লাস্টার থেকে।

 

সেই চরম তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অজানা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রহস্যময় মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক ধরনের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি হয়।

 

কারণ একটি ছোট অবহেলা, তথ্য গোপন বা স্বচ্ছতার অভাব যেকোনো সময় আরেকটি নতুন ও ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক মহামারির জন্ম দিতে পারে, যার পরিণতি গোটা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগেও অনেক সময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব হয় না। দারিয়া শিপিলোভার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছে বলে আপাতত চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ধারণা।

 

একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত গবেষণাগারে কাজ করা সত্ত্বেও তার মৃত্যু কীভাবে হলো, তা হয়তো চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে আপাতত একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই রয়ে যাবে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক বিবৃতি অন্তত এইটুকু স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে যে, মানবসভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ প্লেগ রোগের নতুন কোনো প্রাদুর্ভাব আপাতত সাইবেরিয়ার ওই অঞ্চল থেকে শুরু হচ্ছে না।

 

এখন দেখার বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত চাপের মুখে রাশিয়া ভবিষ্যতে এই ঘটনার আরও কোনো বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে কি না, যা এই রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করবে।

 

- আল জাজিরা