শনিবার, জানুয়ারী ২৪, ২০২৬
১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কিডনি দিলেন স্ত্রী, পরকীয়ায় জড়ালেন স্বামী—এই ভালোবাসার গল্প নয়, এক নারীর জীবনের নির্মম বাস্তবতা”

RNS News

RNS News

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৫, ০৯:০৭ এএম

কিডনি দিলেন স্ত্রী, পরকীয়ায় জড়ালেন স্বামী—এই ভালোবাসার গল্প নয়, এক নারীর জীবনের নির্মম বাস্তবতা”

ভালোবাসা কি নিঃস্বার্থ হয়? কেউ কেউ হয়তো বলে, ভালোবাসা মানেই ত্যাগ। কিন্তু যখন সেই ত্যাগের প্রতিদান হয় প্রতারণা, নির্যাতন আর পরকীয়া— তখন ভালোবাসা শব্দটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ লাগে। সাভারের কলমার এক সাধারণ নারী উম্মে সাহেদীনা টুনির জীবনের গল্প যেন ঠিক এমনই—যেখানে ভালোবাসার সবটুকু দিয়েছেন তিনি, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন হৃদয়বিদারক প্রতারণা। নিজের কিডনি দিয়ে স্বামীকে মৃত্যু থেকে ফিরিয়ে এনে যখন তিনি একটু সুখের আশায় বুক বেঁধেছিলেন, তখনই শুরু হলো জীবনের অন্ধকার অধ্যায়।

২০০৬ সালে টুনির বিয়ে হয় মালয়েশিয়া প্রবাসী মোহাম্মদ তারেকের সঙ্গে। সংসারটা স্বপ্নের মতো চলছিল। এক বছরের মাথায় তাঁদের ঘরে আসে একমাত্র পুত্রসন্তান। কিন্তু এরপরই জীবনে আসে ঝড়। ২০০৮ সালে হঠাৎ জানা যায়, তারেকের দুইটি কিডনিই প্রায় অকেজো। ডায়ালাইসিস ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। তখনকার ১৭ বছরের এক তরুণী মা— নিজের কষ্টের কথা না ভেবে স্বামীকে বাঁচানোর লড়াই শুরু করেন। শুরু হয় বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়বহুল পথচলা। স্বর্ণালংকার বিক্রি, নিজের আয়, এমনকি মায়ের পেনশনের টাকাও ব্যয় করেন স্বামীর চিকিৎসায়। দশ বছর ধরে চলে চিকিৎসা। ২০১৯ সালে দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে নিজের একটি কিডনি স্বামীকে দান করে দেন টুনি।

তখনও তিনি ভাবেননি, তাঁর এই আত্মত্যাগের প্রতিদান এমন ভয়াবহ হবে। সুস্থ হয়ে ফিরেই তারেকের রূপ পাল্টে যায়। শুরু হয় টুনির ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। কিডনি প্রতিস্থাপনের পরপরই হাসপাতালে টুনির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন তারেক। এরপর দেশে ফিরে আরও নির্মম চিত্র। তারেক ঢাকায় গিয়ে “কাজের কথা” বলে থাকতেন, পরে জানা যায়—ডিভোর্সি এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরকীয়া চলছে। অনলাইন জুয়াতে আসক্ত হয়ে পড়েন, আর টুনিকে চাপ দিতে থাকেন তার আয় ও বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দিতে।

যে নারী নিজের সব কিছু দিয়ে স্বামীকে বাঁচিয়েছেন, সেই নারীকেই একসময় মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন তারেক। এমনকি চেয়েছেন ডিভোর্স দিয়ে পুরো বাড়িটা নিজের নামে নিতে। শেষ পর্যন্ত টুনি বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ করেন এবং নারী নির্যাতন ও যৌতুক আইনে মামলা করেন। মামলায় তারেক এক মাস কারাভোগ করলেও জামিনে বেরিয়ে আবারো প্রেমিকার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন।

টুনির কথায়, “যে মানুষটিকে আমি ফেরেশতার মতো বিশ্বাস করতাম, সেই কিনা আজ আমার সর্বনাশ করলো। কিডনি দেওয়ার পর আমার শরীর দিন দিন ভেঙে যাচ্ছে, চিকিৎসকেরা বলছেন আমার সুস্থভাবে বেঁচে থাকা কঠিন। অথচ সেই মানুষটা আমাকে আরেকজনের জন্য ছাড়ল, নির্যাতন করল, বাড়ি থেকে বের করে দিল!”

আইনজীবীরা বলছেন, টুনি চাইলে ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনে’ প্রতারণার মামলাও করতে পারেন। কারণ একমাত্র জীবনদাতা স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করে, কিডনি নিয়ে তারপরই নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে তারেক।

টুনির মা বলেন, “আমরা একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করে ওদের থাকার জন্য বাড়ি করেছি। বাড়ির অর্ধেক মেয়ের নামে আর অর্ধেক তারেকের নামে দিয়েছি। এখন সে পুরো বাড়ি নিজের নামে লিখে নিতে মেয়েকে মারছে, চাপ দিচ্ছে। এই প্রতারকের কঠিন শাস্তি চাই।”

এই ঘটনা কেবল একটি বিবাহিত জীবনের করুণ পরিণতি নয়—এটি এক নারীর অসীম আত্মত্যাগের প্রতিদানে সমাজে লুকিয়ে থাকা নরপিশাচদের মুখোশ উন্মোচন করে। আমরা চাই, এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। যেন কোনো নারী আর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে নিজের জীবনকে ধ্বংস না করেন। যেন স্বামীকে কিডনি দিয়ে জীবন ফেরানোর পর, একজন নারীকে তারই বাড়ি থেকে বের করে না দেওয়া হয়।