সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় একটি ফিলিস্তিনি কবরস্থান ভারী যন্ত্র দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে নতুন করে একটি সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ শুধু সাময়িক উপস্থিতির জন্য নয়, বরং গাজার ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত একুশ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই চুক্তিতে গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
কিন্তু উপগ্রহের তথ্য বলছে, সেনা প্রত্যাহারের বদলে ইসরায়েল সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও সুসংহত করেছে। গত মে মাস পর্যন্ত গাজার ভেতরে অন্তত চল্লিশটি পৃথক সামরিক ঘাঁটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে আটটি ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে। উত্তর গাজা, মধ্যাঞ্চল এবং নেতজারিম এলাকার সংযোগ সড়কগুলোতে গড়ে ওঠা এসব ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
ইসরায়েলের এই সম্প্রসারণবাদী নীতির বিষয়টি খোদ দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে তিনি গাজার অধিকাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা স্বীকার করে জানান, বর্তমানে তারা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ষাট শতাংশ তথাকথিত 'ইয়েলো লাইন' বা সামরিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে নিজেদের দখলে রেখেছেন এবং ভবিষ্যতে এটি সত্তর শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরোনো সামরিক ঘাঁটিগুলোর আয়তন বাড়িয়ে সেখানে নতুন সাঁজোয়া যান, গভীর পরিখা ও অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাধীন চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাউই মনে করেন, ইসরায়েলের বর্তমান নিরাপত্তা নীতির মূল লক্ষ্যই হলো ভূখণ্ড দখল এবং এমন একটি সীমানা নির্ধারণ করা যেখানে কোনো ফিলিস্তিনি জনবসতি থাকবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিশাল সামরিক নির্মাণকাজ নতুন করে সংঘাতের অবকাঠামো তৈরিরই অংশ। এদিকে, গাজায় আগ্রাসনের মানবিক মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আগ্রাসনে গাজায় এ পর্যন্ত প্রায় তেহাত্তর হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং এক লাখ বাহাত্তর হাজার নয়শ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
এমনকি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত সাত মাসেও সংঘাত থামেনি; এই সময়ে অন্তত নয়শ ঊনত্রিশ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজার আটশ এগারোজন মানুষ আহত হয়েছেন।