জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্র থামিন আল-খিতান এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি এই অঞ্চলের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিতে পারে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র থামিন আল-খিতান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হওয়ার প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু শান্তির পরিবর্তে আমরা ক্রমাগত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে দেখছি। এসব হামলায় সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছে এবং লেবাননের বেসামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্বেগজনক হুমকি, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী মেনে চলার জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছে। তবে জাতিসংঘের এই অভিযোগের বিপরীতে ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানের পক্ষে ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, গত বছরের নভেম্বর থেকে তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনকারী হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, এই সময়ে তাদের অভিযানে ৩৫০ জনেরও বেশি সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মতে, হিজবুল্লাহ সদস্যরা প্রায়শই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে লোকালয়ে মিশে থাকে এবং সেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে, যা বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পার্থক্য করাকে জটিল করে তোলে।
যদিও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি বা মেথডোলজি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবে দুই পক্ষের তথ্যের এই বিশাল ব্যবধান আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। প্রায় এক বছর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় লেবানন সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তে উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় মনে করে, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এবং হামলার জবাবদিহিতা তৈরি না হলে, এই সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার ওপর সংস্থাটি বারবার জোর দিচ্ছে। জেনেভার এই সংবাদ সম্মেলন থেকে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা নিরসনে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
অন্যথায়, লেবানন সীমান্তে যে রক্তিক্ষয়ী সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হুমকিতে ফেলবে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের প্রয়োজন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।