চীনের এই বিতর্কিত অবস্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনীতি, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তীব্র বৈরিতা এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ষাটের দশক থেকেই চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন পাকিস্তানকে দেখত ভারতের শক্তি খর্ব করার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখার এক অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে। অন্যদিকে, ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠতা চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭১ সালের আগস্টে স্বাক্ষরিত ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির ফলে বেইজিং নিশ্চিত হয় যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার উদ্যোগ আসলে পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার এবং চীনকে ঘিরে ফেলার এক রুশ-ভারতীয় চক্রান্ত। মাও সেতুং সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির প্ররোচনা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়াকে নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে জরুরি মনে করেছিলেন।
তাছাড়াও, স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে পাকিস্তানের গুরুত্ব চীনের কাছে ছিল অপরিসীম। পাকিস্তান তখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছিল। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক বেইজিং সফর ইসলামাবাদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়, যা চীন-মার্কিন সম্পর্ক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। এমন পরিস্থিতিতে কৌশলগত মিত্র পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করা চীনের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
তাই সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও চীন পাকিস্তানকে প্রচুর সমরাস্ত্র, যেমন-টাইপ-৫৯ ট্যাংক ও এফ-৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করে। জাতিসংঘেও তারা পাকিস্তানের পক্ষে সরব ভূমিকা পালন করে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ভেটো প্রদানসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যুদ্ধের পরেও দীর্ঘ সময় চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির প্রস্তাবে ভেটো দেয় বেইজিং। মূলত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশকে ভারতের প্রভাববলয়ে থাকা একটি দেশ হিসেবেই বিবেচনা করত।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭১ সালে চীনের এই ভূমিকা ছিল আবেগবর্জিত ও কঠোর বাস্তববাদী রাজনীতির প্রতিফলন। সেখানে মানবিকতা বা গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের চেয়ে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা কৌশলই প্রাধান্য পেয়েছিল। ইতিহাসের এই অধ্যায় আজও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় মানবিকতার পরাজয় ঘটে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে।