পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে পল্লবীর ছয় নম্বর সেকশনের সি ব্লকের দশ নম্বর সড়কের একটি আবাসিক ভবন থেকে ওই নারীর মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হানিফ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের বেশ কয়েক দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় নির্ধারণের জন্য মরদেহটি ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই বেদনাদায়ক মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতার এক করুণ ইতিহাস।
অনুসন্ধান ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মৃত সেলিনা আফরোজের স্বামী মমিনুল হক এবং তাঁর দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও কলহের কারণে প্রায় বারো বছর আগে তিনি কানাডা ছেড়ে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসেন।
দেশে ফেরার পর থেকে তিনি পল্লবীতে তাঁর বাবার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ভবনের একটি অংশে সম্পূর্ণ একাকী জীবনযাপন করছিলেন। যদিও ওই একই ভবনের চার তলায় তাঁর এক বোন বসবাস করতেন, তবুও সেলিনা আফরোজের প্রাত্যহিক জীবন ছিল চরম বিচ্ছিন্ন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গত ছাব্বিশে মে রাত আনুমানিক এগারোটার দিকে তাঁর ভাতিজা আশফাকুর রহমানের সঙ্গে সেলিনা আফরোজের সর্বশেষ মুঠোফোনে কথা হয়েছিল।
এরপর থেকে পরিবারের বা পরিচিতজনদের কেউ আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। দীর্ঘ সময় কোনো খোঁজ না পেয়ে একপর্যায়ে পুলিশকে অবহিত করা হলে এই মর্মান্তিক ঘটনার উন্মোচন হয়।
মহানগরে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে প্রবীণ ও একাকী মানুষের সুরক্ষার অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি এই ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় সামনে এসেছে।
এর আগেও কাছাকাছি সময়ে পল্লবীর ছয় নম্বর সেকশনেরই আরেকটি বাসা থেকে এক নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ, যা এই সামাজিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
সেই ঘটনায় মৃত নারীর সন্তানরা সমাজে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন, যাদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্মসচিব, একজন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন কানাডা প্রবাসী ছিলেন।
আধুনিক নগর জীবনে আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়া এবং সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের থাকা সত্ত্বেও মা-বাবার এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত পরিণতি এক গভীর সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।