সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রিজন ভ্যান থেকে দুর্ধর্ষ আসামি ‘পিচ্চি রাজা’র পলায়ন, পাঁচ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

প্রিজন ভ্যান থেকে দুর্ধর্ষ আসামি ‘পিচ্চি রাজা’র পলায়ন, পাঁচ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
ছবি : Collected

আদালতে আইনি হাজিরা সম্পন্ন করে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে শৌচাগারে যাওয়ার বাহানা দিয়ে প্রিজন ভ্যান থেকে ২৫টি মামলার কুখ্যাত আসামি ‘পিচ্চি রাজা’র পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দায়িত্বে চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা ত্রুটির প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা করা হয়েছে।

 

সোমবার সকালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান গণমাধ্যমের কাছে এই চাঞ্চল্যকর পলায়নের ঘটনা এবং তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

দায়িত্ব পালনকালে এমন আকস্মিক ও গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত রোববার সকালে কুখ্যাত অপরাধী পিচ্চি রাজাকে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে হাজিরা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রিজন ভ্যানে করে গাজীপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

 

আদালতে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ও হাজিরা সফলভাবে শেষ করার পর তাকে পুনরায় প্রিজন ভ্যানে তুলে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এ ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল। গাড়িটি ঢাকা থেকে যাত্রা করে গাজীপুরের অত্যন্ত জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নাওজোড় চত্বরের কাছাকাছি পৌঁছালে বন্দি পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যানের ভেতর থেকে হঠাৎ করেই তার তীব্র প্রাকৃতিক কাজের তাগিদ রয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে শৌচাগারে যাওয়া প্রয়োজন বলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীদের জানান।

 

বন্দির এই আকস্মিক দাবির মুখে প্রিজন ভ্যানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের একটি দল গাড়ি থামিয়ে তাকে রাস্তার পাশের একটি শৌচাগারে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ঘাতক বা পেশাদার অপরাধীদের মতো অত্যন্ত চতুর ও কৌশলী পিচ্চি রাজা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই মুহূর্তের সামান্য অসতর্কতা এবং পরিবেশের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শৌচাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

মুহূর্তের মধ্যে আসামি পলায়নের এই আকস্মিক ঘটনায় প্রিজন ভ্যানে থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও মুহূর্তের পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। একজন শীর্ষস্থানীয় ও একাধিক গুরুতর মামলার দাগী আসামিকে এ ধরনের প্রকাশ্য জনবহুল এলাকা থেকে সুকৌশলে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন।

 

এই গুরুতর পলায়ন ঘটনার সঙ্গে প্রিজন ভ্যানের চালকসহ বন্দি আনা-নেওয়ার সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের বিভিন্ন স্তরের মোট পাঁচজন কর্মকর্তা ও সদস্যের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পেশাগত অবহেলা ও দায়িত্বে বড় ধরনের ত্রুটি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

 

এর প্রেক্ষিতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রিজন ভ্যানের চালকসহ ওই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অবিলম্বে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হয়েছে।

 

এছাড়া এই ঘটনার নেপথ্যে কোনো গভীর অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ, পূর্বপরিকল্পনা কিংবা পেশাগত চরম গাফিলতি ছিল কি না, তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসিসি হেডকোয়ার্টার্স) সরাসরি নেতৃত্বাধীন এই বিশেষ তদন্ত কমিটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সমগ্র বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং খুব শীঘ্রই তাদের মূল তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেবে বলে পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুখ্যাত আসামি পিচ্চি রাজার অপরাধমূলক দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তার বিপজ্জনক রূপটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহাম্মদপুর থানার অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চলতি বছরের ১৯ মে মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক ও অস্ত্র কারবারি হিসেবে সুপরিচিত রাজা ওরফে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

মূলত বিদেশ থেকে পালিয়ে আসার পর রাজা, তার স্ত্রী ও শ্যালক নেপাল থেকে বিমানযোগে দেশে প্রত্যাবর্তন করছেন-এমন সুনির্দিষ্ট ও গোপনীয় তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আগে থেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থান নিয়েছিল।

 

পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন পুলিশের অত্যন্ত পেশাদার ও সময়োপযোগী সহায়তায় বিমানবন্দর থেকেই তাকে এবং তার সহযোগীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের সফল হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নেওয়া এবং আদালতে সোপর্দ করার কার্যক্রম চলতে থাকে।

 

মোহাম্মদপুর থানার ওই সূত্রটি আরও জানিয়েছে যে, এই কুখ্যাত পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন থানায় মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র রাখা, ছিনতাই এবং মারামারিসহ প্রায় বিশ থেকে পঁচিশটি গুরুতর অপরাধের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

 

এই ধরনের একজন দুর্ধর্ষ ও বহু মামলার সাজাপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামিকে স্থানান্তর করার সময় নূন্যতম যে মাত্রার সতর্কতামূলক নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখা বাধ্যতামূলক ছিল, নাওজোড়ের ঘটনায় সেই মানদণ্ড যে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে তা এখন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

দিনের পর দিন ধরে গড়ে ওঠা একটি অপরাধ সিন্ডিকেটের মূলহোতা প্রিজন ভ্যান থেকে এমন ফিল্মি কায়দায় পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর ও এর আশপাশের সমগ্র এলাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক তল্লাশি ও চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে।

 

দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট, সম্ভাব্য আস্তানা এবং সন্দেহভাজন স্থানগুলোতে নিরাপত্তা কড়াকড়ি করা হয়েছে যাতে এই শীর্ষ অপরাধী কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে কিংবা নতুন করে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে না সক্ষম হয়।

 

একই সঙ্গে, বিচারাধীন বা দুর্ধর্ষ অপরাধী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রিজন ভ্যানগুলোতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনভিপ্রেত ও লজ্জাজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অতিরিক্ত কিছু কঠোর নির্দেশিকা ও প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি পলাতক পিচ্চি রাজাকে অতি দ্রুত পুনরায় আইনের আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানিয়েছে।