রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম

বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার ও ভারত নিজেদের সীমানা থেকে এই মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করে তাদের জ্বালানি চাহিদা মেটালেও বাংলাদেশ এতদিন তা থেকে বঞ্চিত ছিল।

 

গত রোববার, সাতাশে সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার বিরুদ্ধে জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীদের করণীয়’ শীর্ষক এই সভায় দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা মেরুকরণ নিয়ে তিনি বিস্তারিত ও সময়োপযোগী আলোচনা করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের মতোই তিনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরেন।

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পূর্ববর্তী শাসনকালকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা স্বৈরাচারী সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকার দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট রাখতেই বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন, আমাদের সমুদ্রসীমার নিচ দিয়ে প্রতিবেশীরা গ্যাস উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ বিগত শাসকেরা দেখেও না দেখার ভান করেছেন। তাদের ভয় ছিল, দেশের নিজস্ব সম্পদ উত্তোলন করলে তাদের বিদেশি নিয়ন্ত্রকেরা হয়তো অসন্তুষ্ট হবেন।

 

এই চরম অবহেলা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই আজ সারা দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে দেশের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

 

তিনি দাবি করেন, বিগত সরকার কেবল সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং উন্নয়নের মিথ্যা বুলি ছড়াতে আটটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল, যা এখন জ্বালানির অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

 

দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের এমন পরিকল্পিত অবমূল্যায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশের চলমান ভয়াবহ জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে জোর দিচ্ছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান।

 

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সারা বিশ্ব যখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা হবে, যাতে স্বাস্থ্যসেবার মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত কোনোভাবেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ব্যাহত না হয়।

 

সাধারণ মানুষকেও তিনি নিজ নিজ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রতি উৎসাহিত করেন। এর পাশাপাশি মন্ত্রী অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হয়।

 

এই উত্তোলিত নিজস্ব গ্যাস ব্যবহার করেই ভবিষ্যতে দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে এবং জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দেশের বিদ্যুৎ ও কৃষিখাতে চলমান অস্থিরতা এবং এর পেছনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

 

তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আদানি গ্রুপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিটির তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দেশে কৃত্রিম বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করার হীন উদ্দেশ্যে আদানি গ্রুপ বর্তমানে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ সরবরাহ না করে তা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।

 

অন্যদিকে, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের প্রাণ কৃষকদের বিপদে ফেলতে একটি অসাধু চক্র সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছিল। মন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সারের ডিলাররা চোরাই পথে সার বিক্রি করে কিছু কিছু জেলায় এই সাময়িক সংকট সৃষ্টি করেছিল।

 

তবে বর্তমান সরকার অত্যন্ত কঠোর হস্তে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের চেয়েও বর্তমানে দেশে অধিক পরিমাণে সার মজুত রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন। কোনো উপজেলায় এখন আর সারের ন্যূনতম ঘাটতি নেই।

 

কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং পুরোনো অসাধু ডিলারদের দুর্নীতি ঠেকাতে সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে একজন প্রধান ডিলার এবং তার অধীনে আরও তিনজন সাব-ডিলার নিয়োগ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

এর ফলে সারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং কোনো ষড়যন্ত্রকারী চক্র আর কৃষকদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া বিগত সরকারের বিভিন্ন ভ্রান্ত নীতি, বিশেষ করে ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

 

তিনি এই প্রকল্পগুলোকে ‘চুরির রেন্টাল’ হিসেবে অভিহিত করে অভিযোগ করেন যে, দেশে পর্যাপ্ত কয়লা বা নিজস্ব জ্বালানির সংস্থান না করেই কেবল কতিপয় দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীকে কোটি কোটি টাকা লুটের সুযোগ করে দিতেই এই অপরিকল্পিত কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছিল।

 

দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যারা বিদেশে রক্তপানি করা পরিশ্রম করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন, সেই কষ্টার্জিত ডলার ব্যয় করা হয়েছে বিদ্যুৎ না পেয়েও এই কুইক রেন্টালগুলোর ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস বসে থাকার ভাড়া পরিশোধ করতে।

 

মন্ত্রী এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমান সরকার যখন এই দুর্নীতি ও লুটপাটের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, ঠিক তখনই বিদেশি অনুচর এবং ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার যাত্রাকে ব্যাহত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। প্রতিবেশী দেশের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যা ও খরা পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় বহুল কাঙ্ক্ষিত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

 

মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্ষাকালে ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দিয়ে আমাদের ভাসিয়ে মারা হবে, আর শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে আমাদের কৃষিজমিকে খরায় পুড়িয়ে মারা হবে-এমন অমানবিক পরিস্থিতি আর কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।

 

একই সঙ্গে সুরমা নদীর পানি আটকে রেখে সিলেট অঞ্চলকে উজাড় করে দেওয়ার যে নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে, তা-ও বর্তমান সরকার কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিখাতকে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও প্রতিবেশীর অন্যায্য আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি এবং সরকার এই বিষয়ে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের কাছে মাথা নত করবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন।

 

মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় সভায় স্থানীয় রাজনীতি এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আরও অনেক বিশিষ্ট নেতা বক্তব্য প্রদান করেন।

 

সভায় উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত এবং একই আসনের আরেক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর। এছাড়াও মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নূরতাজ আলম বাহার, গোলাম কিবরিয়া সাঈদসহ জেলা বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই সভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা শোনেন।

 

দেশব্যাপী চলমান পরিকল্পিত অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের সর্বদা সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে এই সভার সমাপ্তি টানা হয়। সভা শেষে বর্তমান সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও সমর্থন প্রদর্শন এবং যেকোনো ধরনের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়, যেখানে স্বয়ং মন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বকুল সরাসরি অংশগ্রহণ করে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনোবল বৃদ্ধি করেন।