শনিবার, ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর দুই হাজার ছাব্বিশ, দুপুর আড়াইটার দিকে গোপন সূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা যৌথভাবে এই সমন্বিত ও সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
বিগত সময়ের সরকারবিরোধী গোপন তৎপরতা চালানো এবং রাজধানীর অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার লক্ষ্যে সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট দলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানে আটককৃত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে হাতকড়া পরিয়ে নিকটস্থ পল্টন মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তাদেরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
দেশের বর্তমান নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রধান কার্যালয় ব্যবহার করে গোপন বৈঠকের ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের নেপথ্যে ছিল রাজধানীর ভিন্ন একটি এলাকায় ঘটে যাওয়া সহিংস রাজনৈতিক ঘটনা। শনিবার দুপুর আনুমানিক বারোটার দিকে ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী একটি ঝটিকা মিছিল বের করার অপচেষ্টা চালান।
সেই মিছিল থেকে আকস্মিকভাবে কয়েকটি বিকট শব্দে ককটেল বা হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, যার ফলে সাধারণ পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করতে ধানমন্ডি ও এর আশেপাশের এলাকায় তাৎক্ষণিক সচল অভিযান শুরু করে পুলিশ।
সেই প্রাথমিক অভিযানের অংশ হিসেবে ধানমন্ডি এলাকা থেকে মিছিলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত তিনজনকে আটক করা হয়। এর পাশাপাশি, গোপন খবরের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ পৃথক একটি অভিযান চালিয়ে তাজা হাতবোমাসহ আরও এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
ধানমন্ডির সেই সহিংস ঝটিকা মিছিলে অংশ নেওয়া একাধিক নেতাকর্মী পুলিশের ধাওয়া খেয়ে স্থান ত্যাগ করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে গুলিস্তানের জাসদ কার্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন বলে তদন্তকারী সংস্থাসমূহ নিশ্চিত হয়েছে।
জাসদ কার্যালয়কে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেওয়ার আগেই অবশ্য সেখানে শতাধিক নেতাকর্মীর একটি বৃহত্তর সমাবেশ ঘটেছিল বলে তথ্য উঠে এসেছে। দুপুরের দিকে জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ও আত্মগোপনে থাকা বহিরাগত নেতাকর্মীদের অবস্থান ও গোপন বৈঠকের সংবাদ দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এই তথ্য জানাজানি হওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয় রাজনীতিতে একটি চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি অনুধাবন করে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সম্মানিত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে পল্টন থানা যুবদলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং জাসদ কার্যালয়ের চারপাশ ঘেরাও করে রাখেন, যাতে ভেতরে অবস্থানরত কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করার আগেই খবর পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ এবং উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে গোয়েন্দা শাখা এবং ক্রাইম বিভাগের বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ সদস্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান।
তারা পুরো ভবনটি নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ফেলে বিকেল চারটা পর্যন্ত একটি সুনিয়ন্ত্রিত অভিযান পরিচালনা করেন এবং সেখান থেকে অভিযুক্তদের একে একে গ্রেপ্তার করে গাড়িতে তোলেন।
রাজধানীতে ঘটে যাওয়া এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের সার্বিক বিষয় নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান কার্যালয়ের ভেতরে বহিরাগতদের উপস্থিতি এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল।
তিনি জানান, কার্যালয়ের ভেতর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেওয়া হয় এবং সেখানে বহুসংখ্যক বহিরাগত ব্যক্তি এসে জড়ো হয়ে গোপন বৈঠক করছিলেন।
এমন খবরের সত্যতা যাচাই এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুসংহত করার স্বার্থে ক্রাইম বিভাগ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কয়েকটি চৌকস দল মিলে এই সুনির্দিষ্ট যৌথ অভিযানটি পরিচালনা করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অভিযান চলাকালেই সন্দেহভাজন হিসেবে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের পরিচয় সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য পল্টন মডেল থানায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
বর্তমানে সেখানে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং অপরাধের ধরন, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক রেকর্ড ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা বিশ্লেষণ করে পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আইনগত প্রক্রিয়া ও অনুসন্ধানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে পল্টন মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর ইসলাম জানান যে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই তারা যৌথ অভিযান পরিচালনা করে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে পুলিশি হেফাজতে এনেছেন।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ঢালাওভাবে কাউকে অভিযুক্ত করার পরিবর্তে আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আটককৃত প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ট্র্যাকিং তথ্য এবং সাম্প্রতিক সময়ের কার্যকলাপ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
যদি জিজ্ঞাসাবাস এবং প্রাথমিক তদন্তে কারো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা সহিংসতার সাথে সম্পৃক্ততা না পাওয়া যায়, তবে সে বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের ককটেল বিস্ফোরণ, গোপন ষড়যন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় সরাসরি অংশ নেওয়ার সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদেরকে সুনির্দিষ্ট হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে সোপর্দ করা হবে।
একইদিনে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এবং গুলিস্তানের মতো রাজধানীর তিনটি অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিচালিত এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা প্রমাণ করে যে, সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
জনমনে শান্তি বজায় রাখতে এবং সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে ডিএমপির বিশেষ দলগুলো বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রধান রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢুকে এভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের গোপন বৈঠক করার ঘটনা কেবল একটি আইনগত বিষয় নয়, বরং এর পেছনে গভীর কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি দপ্তরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পুলিশের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের কোনো নাশকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ নাগরিক ও দর্শীরা।
পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আটককৃতদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, নথিপত্র ও ডিজিটাল উপাদানগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই গোপন বৈঠকের মূল আয়োজক এবং নেপথ্যে থেকে কারা দিকনির্দেশনা ও অর্থায়ন করছিলেন, তাদের পরিচয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনসমক্ষে উন্মোচন করা হবে।
জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে চলা বিভিন্ন দোলাচলের মধ্যে এই বিপুলসংখ্যক আটকের ঘটনা বিচারব্যবস্থা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পল্টন মডেল থানা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে সত্য ঘটনা অবহিত করা হবে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার সকল পর্যায় স্বচ্ছতার সাথে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে।