বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাড়ির চাপায় শ্রমিকের মৃত্যু, ৯ লাখ টাকায় রফাদফার দাবি আইনজীবীর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৩২ পিএম

গাড়ির চাপায় শ্রমিকের মৃত্যু, ৯ লাখ টাকায় রফাদফার দাবি আইনজীবীর
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত সুরক্ষিত ও অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চলে সংঘটিত একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

এই অভিজাত এলাকার একটি শান্ত ফুটপাতে প্রতিদিনের মতো বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী হাসান মীম নামের এক সাধারণ নির্মাণশ্রমিক। কিন্তু কে জানত, এই বিশ্রামই তার জীবনের শেষ বিশ্রামে পরিণত হবে!

 

একটি বেপরোয়া গতির ব্যক্তিগত গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হয় এই খেটে খাওয়া মানুষটিকে। এই অমানবিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর আজান আলী শরীফের জামিন আবেদন এবং এর প্রেক্ষাপটে উঠে আসা নানাবিধ চাঞ্চল্যকর তথ্য এখন আইনি অঙ্গনে এবং সামাজিক পরিসরে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

বিশেষ করে, জীবনহানির মতো একটি গুরুতর অপরাধের পর আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার যে দাবি আসামিপক্ষ থেকে করা হয়েছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার, চব্বিশে সেপ্টেম্বর, ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-আট এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার সন্দেহভাজন কিশোর আসামির পক্ষে জামিনের আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

 

আসামিপক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আলমগীর হোসেন আদালতে এই আবেদনটি দাখিল করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে যেমন একটি ঘটনার পেছনের বহুমুখী দিক বিশ্লেষণ করা হয়, তেমনি এই বিচারিক প্রক্রিয়াতেও আসামিপক্ষের দাবি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রাপ্ত প্রমাণের মধ্যে এক বিরাট ফারাক বা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

একদিকে আসামিপক্ষ বিষয়টিকে একটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এটিকে একটি বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে আটক রাখার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছে।

 

আদালতে দাখিল করা জামিন আবেদনে আসামিপক্ষের আইনজীবী বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন, যা ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যার চেষ্টা করে। আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনার সময় অভিযুক্ত ওই কিশোর গাড়িটি চালাচ্ছিল না; বরং সে চালকের পাশের আসনে, অর্থাৎ যাত্রীর আসনে বসা ছিল।

 

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায় আংশিকভাবে নিহত ব্যক্তির শারীরিক সীমাবদ্ধতার ওপর চাপানোর একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টাও জামিন আবেদনে লক্ষ্য করা গেছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিহত নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম একজন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষ ছিলেন।

 

আসামিপক্ষের ভাষ্যমতে, বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা গাড়িটি বারবার সতর্কতামূলক হর্ন বাজানো সত্ত্বেও নিহত ব্যক্তি তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই শব্দ শুনতে পাননি এবং দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে ব্যর্থ হন, যার ফলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি ঘটে।

 

তবে, একজন ঘুমন্ত ও নিরীহ মানুষের ওপর গাড়ি তুলে দিয়ে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা মানবাধিকার কর্মী ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চরম বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

 

জামিন আবেদনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল অংশটি হলো আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি জীবনের মূল্য নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে আপস-মীমাংসার বিষয়টি। আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি আপস-মীমাংসা সম্পন্ন হয়েছে।

 

এই মীমাংসার শর্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থাৎ নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে নগদ নয় লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। একটি হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এই ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাদের সাময়িক উপকারে আসলেও, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুতর অভিযোগকে কেবল অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার এই প্রবণতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় বলে মনে করছেন সমাজতাত্ত্বিকরা।

 

এটি সমাজে এই বার্তাই দেয় যে, বিত্তবানরা চাইলেই অর্থের জোরে যেকোনো অপরাধ করে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে, আসামিপক্ষের এই দাবি ও আর্থিক রফাদফার হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার উপস্থাপিত জোরালো প্রমাণ ও যুক্তির কারণে।

 

এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক মো. আরিফীন ইসলাম ওই কিশোরকে আদালতে হাজির করে তদন্তের স্বার্থে তাকে পুলিশি হেফাজতে বা আটক রাখার জোর আবেদন জানিয়েছেন।

 

তিনি আদালতকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অবহিত করেন যে, আসামিপক্ষ যতই দাবি করুক না কেন কিশোরটি যাত্রীর আসনে ছিল, বাস্তব প্রমাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ঘটনাস্থল এবং এর আশেপাশের এলাকার সমস্ত নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তা তার আবেদনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সংগৃহীত ভিডিও চিত্রগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিগত গাড়িটির ডান দিকের দরজা, অর্থাৎ চালকের বসার আসনের দরজা খুলে ওই কিশোর আজান আলী শরীফকে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসতে দেখা যায়।

 

এই অকাট্য চাক্ষুষ প্রমাণটি আসামিপক্ষের 'পাশের আসনে বসে থাকার' দাবিকে সম্পূর্ণভাবে নস্যাৎ করে দেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে আশ্বস্ত করেন যে, এই মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে আজান আলী শরীফের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক ও শক্তিশালী সত্যতা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে।

 

যেহেতু মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চলমান রয়েছে এবং এর পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ইন্ধন বা আড়াল করার চেষ্টা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তাই মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের বৃহত্তর স্বার্থে এই মুহূর্তে অভিযুক্তকে কোনোভাবেই জামিন দেওয়া সমীচীন হবে না বলে তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেন।

 

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে আরও একটি রহস্যজনক দিক হলো মামলার প্রাথমিক অভিযোগপত্রের বিবরণ। নিহত মেহেদী হাসান মীমের বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গত তেইশে সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনের অধীনে এই মামলাটি দায়ের করেন।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাদী তার দায়ের করা এজাহারে গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের চুয়াল্লিশ বছর বয়সী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এজাহারে বাদী অভিযোগ করেছেন যে, ওই ব্যক্তি অত্যন্ত বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালিয়ে তার নিরপরাধ ভাইকে চাপা দিয়ে গুরুতর আহত করেন, যার ফলশ্রুতিতে তার মৃত্যু ঘটে।

 

এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিও চিত্রে চালকের আসন থেকে কিশোর আজান আলী শরীফকে বের হতে দেখা গেলেও, মামলার কাগজপত্রে আকাশ মারক নামের ওই বয়স্ক ব্যক্তিকে কেন চালক হিসেবে দেখানো হলো?

 

এটি কি প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে এবং প্রভাবশালী পরিবারের কিশোর সন্তানকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে কোনো সাজানো কৌশল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অজানা কারণ লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ঘটনাগুলো একটি সমাজের গভীরতর বৈষম্য ও আইনের শাসনের দুর্বলতাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ফুটপাতে ঘুমন্ত একজন প্রান্তিক শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা যেখানে সমাজ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অর্থের বিনিময়ে আপস করার এই অপসংস্কৃতি যেকোনো গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য উদ্বেগজনক।

 

অভিজাত এলাকায় তরুণদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে এর আগেও অনেক নিরীহ পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পরই প্রভাবশালী মহল নিজেদের দাপট দেখিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে আপস করতে বাধ্য করে।

 

মেহেদী হাসান মীমের অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নকেই ধূলিসাৎ করেনি, বরং এটি সমাজব্যবস্থার একটি রূঢ় বাস্তবতাকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে। নিহত মেহেদীর পরিবার নয় লাখ টাকার বিনিময়ে হয়তো তাদের দারিদ্র্য থেকে সাময়িক মুক্তি পাবে, কিন্তু একজন মায়ের বুক খালি করে যে সন্তান চিরতরে হারিয়ে গেল, সেই শূন্যতা কোনো অর্থ দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।

 

একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইনের চোখে সবাই সমান-এই চিরায়ত সত্যটি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে। এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি এবং নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে আছে সমগ্র সমাজ, যারা প্রত্যাশা করে যে, অর্থ বা ক্ষমতার দাপট নয়, বরং সত্য ও ন্যায়বিচারই শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হবে।