বুধবার রাতের অন্ধকার থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চলা এই সাঁড়াশি অভিযানে কুমিল্লা নগরীসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে মোট ছয়শত চব্বিশ জনকে আটক করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশের মতো কুমিল্লাতেও কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছিল, পুলিশের এই তড়িৎ ও বৃহৎ পদক্ষেপ সেই উদ্বেগ নিরসনে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার, চব্বিশে সেপ্টেম্বর সকালে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং গণমাধ্যম শাখার প্রধান কর্মকর্তা লুৎফর রহমান সাংবাদিকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক বিস্তারিত বার্তায় তিনি জানান যে, সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ প্রশাসন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরেই গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় জনসাধারণের কাছ থেকে উঠতি বয়সী তরুণদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে গুরুতর সব অভিযোগ আসছিল।
চুরি, ছিনতাই, পাড়ায় পাড়ায় আধিপত্য বিস্তার, সাধারণ পথচারী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা এবং মাদক সেবনের মতো অসামাজিক ও বেআইনি অপরাধের সঙ্গে এই কিশোরদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাচ্ছিল পুলিশ।
এরই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার সুযোগ্য পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের সরাসরি নির্দেশে এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে অপরাধ দমনের এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ও অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই বিশাল অভিযানের ছক কষা হয়, যাতে কোনো অপরাধী চক্র আগে থেকে সতর্ক হওয়ার বা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়।
নির্দেশনার পরপরই বুধবার রাতে জেলার আঠারোটি থানার পুলিশ সদস্যগণ একযোগে মাঠে অবতীর্ণ হন। শুধু কুমিল্লা নগরীর অলিগলি বা প্রধান সড়কগুলোতেই নয়, বরং প্রতিটি থানা এলাকার যেসব স্থানে বখাটেদের নিয়মিত আড্ডা বসে এবং যেসব এলাকাকে কিশোর গ্যাংয়ের অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, ঠিক সেসব সুনির্দিষ্ট স্থানেই একযোগে অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।
এই অভিযানে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণও সশরীরে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তাদের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে অভিযানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
জনবহুল এলাকা, পার্ক, রাস্তার মোড় এবং নির্জন স্থানগুলো যেখানে রাতের বেলা সন্দেহভাজনদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়, সেসব স্থানকে এই অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ের একটি অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
একসময়ের শান্ত ও নির্মল সমাজব্যবস্থায় এই উঠতি বয়সী তরুণদের এমন বেপরোয়া আচরণ ও অপরাধপ্রবণতা সমাজবিজ্ঞানীদেরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বয়ঃসন্ধিকালের নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ, পারিবারিক অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, ভিনদেশি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন এবং সুস্থ বিনোদনের অভাবের কারণে আজ অনেক কিশোরই বিপথগামী হচ্ছে।
তারা নিজেদের মধ্যে দল বা গ্যাং তৈরি করে পাড়ায় পাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করছে। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে এরা আরও বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরা দলবদ্ধভাবে মারামারি, এমনকি খুনোখুনির মতো ভয়ঙ্কর ও জঘন্য অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে নির্দ্বিধায়।
কুমিল্লার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী, অগ্রসর ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জেলায় এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই সমাজের এই পচন রোধ করতে জেলা পুলিশের এই অভিযান কেবল একটি আইনগত পদক্ষেপই নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বার্তাও বহন করে।
সন্দেহভাজন হিসেবে এত বিপুলসংখ্যক অর্থাৎ ছয়শত চব্বিশ জনকে আটকের পর এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত অপরাধীদের নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং নিরপরাধীদের যেকোনো ধরনের আইনি হয়রানি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।
যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আটককৃতদের অনেকেই বয়সে তরুণ, তাই পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শিশু আইন অনুযায়ী, কিশোর অপরাধীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হতে হয় সংশোধনমূলক, কেবল শাস্তিমূলক নয়।
জেলা পুলিশ এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশীয় আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকেই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে। আটককৃত প্রতিটি ব্যক্তির অতীত ইতিহাস, থানায় কোনো পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড বা চলমান মামলা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, যাচাই-বাছাই শেষে যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তথ্য পাওয়া যাবে না, তাদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে পরিবারের জিম্মায় সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হবে।
উঠতি বয়সী এই তরুণদের অনেকেই হয়তো না বুঝে, নিছক কৌতূহলবশত বা পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অপরাধীদের সঙ্গে মিশেছে। তাই তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং বা সংশোধনাগারে পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলার পাশাপাশি একজন কিশোরকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে যাদের বিরুদ্ধে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই বা গ্যাং কালচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অকাট্য প্রমাণ মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কোনো অপরাধীই যেন পার পেয়ে না যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখা হচ্ছে। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাদের এই অবস্থান কোনো সাময়িক চমক বা এককালীন উদ্যোগ নয়।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা এই ভয়াবহ ব্যাধিকে সমূলে উৎপাটন না করা পর্যন্ত পুলিশের এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। এলাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অভিভাবক ও নারীদের নিরাপদে পথ চলার অধিকার নিশ্চিত করতে এবং পাড়া-মহল্লায় বখাটেদের উৎপাত সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান গণমাধ্যমের কাছে তার বক্তব্যের শেষাংশে পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আটককৃতদের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে এবং অতীত রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার পক্ষে এই সামাজিক অবক্ষয় সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব নয়। কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের এই সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেও নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে।
পরিবারকে তার সন্তানের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে; তারা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও সৃজনশীল বিনোদনের ব্যবস্থা করতে। সামাজিক প্রতিরোধ এবং পুলিশের কঠোর আইনি ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল কুমিল্লা জেলা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের মতো ভয়াবহ ব্যাধি চিরতরে দূর করা সম্ভব। পুলিশের এই যুগান্তকারী অভিযান সেই সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গঠনের পথে একটি শক্তিশালী ও অত্যন্ত ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবেই গণ্য হবে।