বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

জাতিসংঘ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চলমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক মঞ্চে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করবেন।

 

সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, তিনি তার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী বক্তব্যটি উপস্থাপন করবেন পরম মমতায় জড়ানো মাতৃভাষা বাংলায়। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ‘গণতান্ত্রিক নবযাত্রা’র এক নতুন ও আত্মবিশ্বাসী রূপরেখা।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে নিরলস সংগ্রাম, তার এক সুস্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ চিত্র উঠে আসবে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈশ্বিক ভাষণে।

 

এইবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ও ভাষণ প্রদান কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।

 

আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম স্থপতি ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার সহধর্মিণী, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে ভাষণ দিয়েছিলেন।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারা উভয়েই দেশের জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক শান্তির সপক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের এই জাতিসংঘ ভাষণকে জিয়া পরিবারের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও বৈশ্বিক কূটনীতির ধারাবাহিকতার এক নতুন ও উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করছেন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

কূটনৈতিক সূত্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বিষয় প্রাধান্য পাবে।

 

তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরবেন।

 

একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব শান্তি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করবেন। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংকট জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম এবং এই সংকট উত্তরণে উন্নত বিশ্বকে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানাবেন তিনি।

 

পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সমাজের মূল চালিকাশক্তি যুবসমাজ এবং নারীদের সার্বিক ক্ষমতায়ন, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার এবং স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও রূপরেখা তার ভাষণে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

 

এছাড়া, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত, সমতামূলক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও তিনি বিশেষ জোর দেবেন। বিশ্বব্যাপী চলমান নানা ধরনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংকটের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়েও তিনি বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট ও গঠনমূলক প্রস্তাবনা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করবেন।

 

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণের এই সম্পূর্ণ অংশটিই অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল মাতৃভাষা বাংলায় প্রদান করবেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে আরও একবার সুউচ্চে প্রতিষ্ঠিত করবে।

 

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মূল ভাষণের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে অত্যন্ত ব্যস্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ সময় পার করছেন। এর আগে গতকাল বুধবার তিনি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা, জনহিতকর প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন।

 

তবে বুধবারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভায় তার কার্যকর ও বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সরাসরি উদ্যোগে এবং গাম্বিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে বুধবার সকালে ‘রোহিঙ্গা সংকট’ শীর্ষক এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

এই বৈঠকে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ মোট আটটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পাঁচটি জরুরি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেন।

 

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই মানবিক সংকটের ভার বহন করতে গিয়ে বাংলাদেশ যে সীমাহীন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের সম্মুখীন হচ্ছে, তা তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, এখন নিছক মৌখিক সহমর্মিতা প্রদর্শনের সময় পার হয়ে গেছে; এখন সময় এসেছে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একেবারে মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করার এবং তার একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান খোঁজার পথে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার।

 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন আর কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় নেই, বরং সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করার সময় এসেছে।

 

বছরের পর বছর ধরে চলা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি কেবল ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এই অমানবিক বাস্তুচ্যুতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটানোর দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই একযোগে এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

 

তার এই বলিষ্ঠ ও সময়োপযোগী বক্তব্য বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এর আগে, নিউইয়র্ক সফরের একেবারে প্রথম দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবারও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কূটনৈতিক ফ্রন্টে অত্যন্ত সরব ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।

 

ওইদিন তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে এবং সাইডলাইনে মোট দশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেন। এই সকল বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন।

 

তার এই নিবিড় ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতার এক বড় স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে সেসব দেশে রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক ও সম্মানজনক আমন্ত্রণ লাভ করেছেন।

 

সার্বিক বিবেচনায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের এই জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।