বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসন হলে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসন হলে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে চরম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সাময়িক বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভূরাজনৈতিক সংকট দ্রুতই কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পর দেশীয় বাজারেও তা পুনরায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে দাম সমন্বয়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলে অত্যন্ত জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বর্তমান সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

 

বৃহস্পতিবার, চব্বিশে সেপ্টেম্বর দুপুরে মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের বিভিন্ন গঠনমূলক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সময়োপযোগী এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক বার্তা প্রদান করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক চাপ থেকে দেশের জনগণকে মুক্ত করতে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বা বাজার ব্যবস্থা যে বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা প্রভাবমুক্ত নয়, সেই অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে রেখে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি প্রকৃত পরিস্থিতি অত্যন্ত বিশদভাবে তুলে ধরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে একটি জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। প্রাকৃতিক গ্যাসের কিছু মজুত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে দৈনন্দিন বিশাল চাহিদা মেটানোর মতো কোনো তরল জ্বালানি তেল উৎপাদিত হয় না বললেই চলে।

 

ফলশ্রুতিতে, দেশের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান পরিবহন খাত, কৃষিক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থা, ভারী শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ অংশের জন্য সরকারকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়।

 

বর্তমানে যে নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলো থেকে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সিংহভাগ জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে, সেখানে এক চরম অস্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।

 

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের যে একটি মসৃণ ও নিরবচ্ছিন্ন শৃঙ্খল ছিল, তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর অনিবার্য ও প্রত্যক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়েছে সারা বিশ্বের জ্বালানি বাজারের ওপর, যার ফলে উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল-প্রায় প্রতিটি দেশেই জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে যে অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং বহুমুখী ব্যয় কাজ করে, সেটিও উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও পেশাদার দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

 

তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন যে, বিদেশ থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত যেকোনো ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যারেলপ্রতি মূল দাম বাড়াই এখানে একমাত্র সমস্যা নয়; বরং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য সংলগ্ন নৌ রুটগুলোতে পণ্য পরিবহনে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

 

এই বর্ধিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির কারণে বৈশ্বিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বীমা প্রিমিয়াম বা ঝুঁকি ভাতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এর সাথে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি। সব মিলিয়ে এক ব্যারেল বা এক লিটার জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশের মাটিতে নিয়ে আসতে এবং তা পরিশোধন করে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে আগের তুলনায় সরকারের আমদানি ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে গেছে।

 

এই বহুমুখী ও মাত্রাতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের কারণেই মূলত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত রাখা বা পূর্বের দামে সমন্বয় না করে রাখা সরকারের জন্য অর্থনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব ও অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

জ্বালানি তেলের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগত পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তা যে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, গণপরিবহন ভাড়া, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণভাবে অবগত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল রয়েছে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, বিশ্ববাজারে যখন প্রথম দাম বাড়তে শুরু করে, তখন সরকার সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বাজারে দাম বাড়ায়নি। বরং দেশের আপামর জনসাধারণকে মূল্যস্ফীতির এই আকস্মিক ও চরম ধাক্কা থেকে রক্ষা করার জন্য সরকার তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ভর্তুকি প্রদান করে প্রায় দীর্ঘ ছয় মাস এই কঠিন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।

 

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকায়, জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে এবং সর্বোপরি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে কোনো টেকসই বিকল্প না পেয়ে সরকারকে শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর এই অত্যন্ত অজনপ্রিয় ও কঠিন সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে বাধ্য হতে হয়েছে।

 

তবে এটি সরকারের কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ বা নীতি নয় বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত গভীরভাবে নজর রাখছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, যুদ্ধ বা সংঘাত কখনোই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান হতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত কার্যকর পদক্ষেপে এই চলমান সংকট খুব দ্রুতই কেটে যাবে।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন যে, যখনই এই আন্তর্জাতিক সংকটের স্থায়ী নিরসন হবে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দাম পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, ঠিক তখনই সরকার বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে অতি দ্রুত দেশের বাজারেও তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনুকূলে নামিয়ে আনার জন্য কার্যকরভাবে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

 

এটি বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার এবং এই বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়ের আগে, বৃহস্পতিবার সকালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় ও পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি সেবা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সভাপতিত্ব করেন মেহেরপুরের সুযোগ্য জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়। এই মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত থেকে সার্বিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর দিকনির্দেশনামূলক ও অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য প্রদান করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

 

স্থানীয় প্রান্তিক পর্যায়ের সমস্যাগুলো সরাসরি শোনা এবং রাজধানী কেন্দ্রিক প্রশাসনের বাইরে তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের যে নিরলস প্রচেষ্টা রয়েছে, এই বিশেষ মতবিনিময় সভাটি তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।

 

এই বিশেষ মতবিনিময় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত গঠনমূলক ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন মেহেরপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিলটন এবং মেহেরপুর জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়।

 

মতবিনিময় সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তারা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ নিজ দপ্তরের চলমান উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা এবং মেহেরপুর জেলার কৃষি, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অপার সম্ভাবনার কথা প্রধান অতিথির সামনে অত্যন্ত সবিস্তারে তুলে ধরেন।

 

একই সঙ্গে, মাঠপর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা যেসব বিদ্যমান স্থানীয় সমস্যা, জনবলের অভাব, কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন, সেগুলোও অত্যন্ত খোলামেলাভাবে প্রতিমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন।

 

এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করে মেহেরপুর জেলার সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক জীবনমান উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করা যায় এবং একটি সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।