এমন অমানবিক ও অপ্রত্যাশিত ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ওই দম্পতি। একটি সভ্য সমাজে এমন মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হওয়া পরিবারের প্রতি যেখানে সহানুভূতি ও সমবেদনা জানানোর কথা, সেখানে উল্টো তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার এই অপপ্রয়াস দেশজুড়ে সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এই ক্রমাগত হুমকির মুখে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার। জানা গেছে, নিহত শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম কুমিল্লা শহরের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
তার মা ডক্টর নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। গত আঠারোই সেপ্টেম্বর একটি দামি মুঠোফোনের লোভে দুর্বৃত্তরা মাত্র তেরো বছর বয়সী এই কিশোরকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এই দম্পতি যখন চরম শোকে মুহ্যমান, ঠিক তখনই তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে পরিচয় গোপন করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ক্রমাগত কল করতে শুরু করে। অজ্ঞাত পরিচয়ধারী ওই ব্যক্তিরা কল করে অত্যন্ত কদর্য ভাষায় গালাগাল করার পাশাপাশি পরিবারটিকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে।
সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার চাওয়ার পথ থেকে তাদের সরিয়ে আনতে কিংবা সামাজিকভাবে তাদের মনোবল ভেঙে দিতেই এমন পরিকল্পিত অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ভয়াবহ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত শিশুটির বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার গত শুক্রবার পঁচিশে সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি আনুষ্ঠানিক সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেছেন।
তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে তার এই অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে জানান যে, শুরুতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতা ব্যবহার করে তাদের নিহত সন্তান এবং তাদের পরিবারকে জড়িয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে নানা ধরনের ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও কুৎসা রটানো শুরু হয়।
এরপর সেই অপতৎপরতা আরও এক ধাপ এগিয়ে তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে সরাসরি আক্রমণের রূপ নেয়। তিনি বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, গত সোমবার রাতে সর্বপ্রথম একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তার মুঠোফোনে কল আসে।
তিনি স্বাভাবিকভাবে কলটি গ্রহণ করে অপর প্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে, ওই ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন রেখে আকস্মিকভাবেই অত্যন্ত অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
পরিস্থিতির আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে ফিরোজ শাহরিয়ার তৎক্ষণাৎ ওই কলটি কেটে দেন। কিন্তু অপরাধীরা এখানেই থেমে থাকেনি। এরপর থেকে ক্রমাগত ভিন্ন ভিন্ন অপরিচিত নম্বর ব্যবহার করে তাকে এবং তার স্ত্রীকে একাধিকবার কল দেওয়া হতে থাকে।
বাধ্য হয়ে তারা ওই নম্বরগুলোকে তাদের মুঠোফোনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবরুদ্ধ করে দেন। কিন্তু তারপরেও নতুন নতুন নম্বর থেকে এই উপদ্রব চলতে থাকে। ফিরোজ শাহরিয়ার অত্যন্ত হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, তারা বর্তমানে সন্তান হারানোর শোকের পাশাপাশি নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও চরম শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন।
সমাজে একজন সম্মানিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা এবং তার পরিবার যদি এমন ন্যক্কারজনক হয়রানির শিকার হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি কোথায়, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এদিকে, এই ক্রমাগত হয়রানি ও হুমকির মুখে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন নিহত শিশুটির মা ডক্টর নাহিদা বেগম। একমাত্র আদরের সন্তানকে হারানোর শোক তাকে এমনিতেই বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে, তার ওপর এমন অমানবিক মানসিক নির্যাতন তার পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।
নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে চরম আতঙ্কিত হয়ে গত শুক্রবার থেকে তিনি তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। একজন শোকাহত মায়ের এমন অসহায়ত্ব পুরো সমাজব্যবস্থার প্রতি একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
যারা এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক এবং চাঞ্চল্যকর অপ্রতিম হত্যা মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ সংবাদমাধ্যমের কাছে এই সাধারণ ডায়েরি দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, তথ্যপ্রযুক্তিগত হয়রানি বা অন্তর্জালে কাউকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার যে কোনো অপচেষ্টাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
শোকাহত পরিবারের প্রতি এমন অশোভন আচরণ এবং হুমকি প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। পুলিশ ইতিমধ্যেই আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অজ্ঞাত নম্বরগুলোর প্রকৃত ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে।
খুব শিগগিরই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি পরিবারটিকে আশ্বস্ত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি হত্যা মামলার তদন্তের পাশাপাশি পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেন।
উল্লেখ্য, গত আঠারোই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা শহরের কোটবাড়ি এলাকা থেকে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র অপ্রতিম। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেদিন বিকেলে সে তার মায়ের একটি দামি মুঠোফোন নিয়ে বাড়ির বাইরে ছবি তুলতে গিয়েছিল।
এরপর সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও সে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার ওই রাতেই সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ছেলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
পুলিশের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরাও চারিদিকে সন্ধান চালাতে থাকেন। অবশেষে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকের ফটক সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সানন্দা গ্রামের একটি নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে পুলিশ শিশুটির নিথর মরদেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিক তদন্ত ও আসামিদের স্বীকারোক্তি থেকে পুলিশ জানতে পারে যে, কেবলমাত্র অপ্রতিমের হাতে থাকা ওই দামি মুঠোফোনটি ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নিয়েছিল চারজন অপরাধী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকেই সফলভাবে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরবর্তীতে নিহত শিশুটির বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে, সিয়াম নামের এক অভিযুক্ত ছাড়া বাকি তিনজন অপরাধী বিচারকের সামনে নিজেদের দোষ স্বীকার করে আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি প্রদান করে।
একটি সামান্য যন্ত্রের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। একটি সভ্য সমাজে অপরাধ সংঘটিত হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধের শিকার হওয়া শোকাহত পরিবারের ওপর নতুন করে এমন মানসিক নির্যাতন ও হয়রানি চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটি এক ধরনের জঘন্য অপরাধ। একদিকে যেমন দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশু অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি যারা পরিচয় গোপন করে এই শোকাহত পরিবারটিকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, তাদেরও সমপরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই ঘটনার তদন্ত শেষ করে ভুক্তভোগী পরিবারকে দ্রুত ন্যায়বিচার ও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধী চক্র এমন হীন কাজ করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।