গোসলের সময়, চিরুনিতে বা সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর বালিশের ওপর গুচ্ছ গুচ্ছ চুল পড়ে থাকতে দেখলে যে কারও মনেই তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গুর মতো একটি গুরুতর সংক্রমণের পর শারীরিক দুর্বলতা ও নানাবিধ উপসর্গের পাশাপাশি এই চুল পড়ার সমস্যাটি অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়।
ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ শরীরকে যে চরম শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের চুলের স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রক্রিয়ার ওপর। অনেকেই এই সময় দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং ভুল চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে যান।
তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে এই সমস্যার মূল কারণ এবং সঠিক সমাধানের উপায় জানা থাকলে এই সংকট থেকে খুব সহজেই এবং প্রাকৃতিকভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মানুষের মাথার প্রতিটি চুল প্রাকৃতিকভাবেই বৃদ্ধি, বিশ্রাম এবং ঝরে পড়ার একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে চুলের স্বাভাবিক জীবনচক্র বলা হয়। কিন্তু যখন শরীর ডেঙ্গুর মতো কোনো ভাইরাসের দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হয়।
একটানা তীব্র জ্বর, রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেটের আকস্মিক পতন, চরম পানিশূন্যতা, খাদ্যে অরুচি এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে শরীরের সমস্ত শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেবল জীবন বাঁচানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সময় শরীর তার জন্য অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর, যেমন চুলের গোড়ায়, পুষ্টি সরবরাহ সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়।
ফলস্বরূপ, চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রক্রিয়া হঠাৎ করেই থমকে যায় এবং বিপুল সংখ্যক চুল অকালেই বিশ্রামের পর্যায়ে প্রবেশ করে। এই চিকিৎসাবস্থাকে বিজ্ঞানীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ নামক একটি অস্থায়ী অবস্থার সাথে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন।
এটি মূলত শারীরিক বা মানসিক আঘাতের পর অস্থায়ী চুল পড়ার একটি অত্যন্ত পরিচিত রূপ। এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চুলের গোড়া ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা ঝরে যেতে বাধ্য হয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে লক্ষণীয় এবং বিভ্রান্তিকর দিকটি হলো চুল পড়ার সময়কাল। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত থাকা অবস্থায় সাধারণত চুল পড়ে না।
বরং রোগ থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠার প্রায় দুই থেকে চার মাস পর হঠাৎ করে এই চুল ঝরে পড়া দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সময়কালের এই বিলম্বের কারণেই সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির শিকার হন। তারা ভাবতে শুরু করেন যে, জ্বর তো অনেক আগেই সেরে গেছে, তাহলে এখন কেন এত চুল পড়ছে?
অনেকেই এই অবস্থাকে নতুন কোনো জটিল রোগের পূর্বলক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়ে অহেতুক মানসিক চাপে ভুগতে থাকেন। কিন্তু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বারবার আশ্বস্ত করেছেন যে, এটি কোনো নতুন অসুখ নয়, বরং কয়েক মাস আগে শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই ভয়াবহ ডেঙ্গু জ্বরেরই একটি বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া মাত্র।
শারীরিক চাপের প্রতি মানবদেহের চুলের এই স্বাভাবিক ও বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে মানুষ অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করতে পারে। চুল পড়ার এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অনেকের মনেই সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঁকি দেয় তা হলো, এই চুল পড়া কি স্থায়ী, নাকি আবার নতুন করে চুল গজানোর কোনো সম্ভাবনা রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ডেঙ্গু বা এ জাতীয় কোনো গুরুতর সংক্রমণের কারণে যে চুল পড়ে, তা কখনোই স্থায়ীভাবে মানুষকে টাক করে দেয় না। এই প্রক্রিয়ায় চুলের গোড়া চিরতরে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং তারা কেবল একটি সাময়িক বিশ্রামের পর্যায়ে চলে যায়।
এই সময় মাথায় কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় গোল হয়ে টাক পড়ে যায় না, বরং সমগ্র মাথা থেকেই সমানভাবে এবং বিক্ষিপ্তভাবে চুল পাতলা হতে শুরু করে। শরীরের ভেতরের সেই প্রাথমিক ধাক্কা বা চাপ যখন ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করে এবং শরীর তার পূর্বের স্বাভাবিক পুষ্টি ও শক্তিতে ফিরে আসে, তখন চুলের গোড়াগুলোও পুনরায় জাগ্রত হয়।
বিশ্রামের পর্যায় শেষ করে তারা আবার স্বাভাবিক বৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করে। তবে এই নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। মাথার চুল প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়, তাই হারানো চুল পুরোপুরি ফিরে পেতে বেশ কয়েকমাস সময় লাগতে পারে।
তবে চুল পড়ার প্রতিটি ঘটনার জন্যই যে কেবলমাত্র ডেঙ্গুকে এককভাবে দায়ী করা হবে, বিষয়টি এমনও নয়। অনেক সময় ডেঙ্গুর পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যাও এই চুল পড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত বা দীর্ঘায়িত করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রক্তস্বল্পতা বা শরীরে আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোনজনিত সমস্যা, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আমিষ বা প্রোটিনের অভাব, ওজন কমানোর জন্য হঠাৎ করে অতিরিক্ত মাত্রায় ডায়েট করা বা উপবাস করা এবং শরীরে অন্যান্য হরমোনের আকস্মিক পরিবর্তন।
এছাড়া বংশগত কারণে চুল পড়ার যে সাধারণ প্যাটার্ন বা প্রবণতা থাকে, সেটিও এই সময়ে আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। তাই ডেঙ্গু পরবর্তী চুল পড়া যদি প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়, অতিরিক্ত মাত্রায় হয় অথবা চুল পড়ার পাশাপাশি শরীরে অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অন্যান্য সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখতে পারবেন। ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় চুলের হারানো স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে রোগীর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস। মানুষের চুল মূলত এক প্রকার বিশেষ কাঠামোগত প্রোটিন দ্বারা গঠিত, যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় কেরাটিন বলা হয়।
যেহেতু চুল গঠনের মূল উপাদানই হলো প্রোটিন, তাই অসুস্থতার পর শরীরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করতে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে উচ্চমানের প্রোটিন বা আমিষ রাখা একান্ত অপরিহার্য।
প্রোটিনের এই চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরণের ডাল, শিমের বিচি, ছোলা, সয়াবিন, টোফু, পনির, দই এবং দুধের মতো খাবার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিম, সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ এবং চর্বিহীন মাংস প্রোটিনের অত্যন্ত চমৎকার এবং কার্যকরী উৎস হতে পারে।
এই প্রোটিন কেবল চুলের গোড়াকেই মজবুত করে না, বরং সার্বিক দুর্বলতা কাটাতেও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। প্রোটিনের পাশাপাশি চুলের সুরক্ষায় আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হলো আয়রন বা লৌহ। শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে চুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মসুর ডাল, সবুজ শাকসবজি, তিল এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন পাওয়া যায়। তবে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষণের জন্য এসব খাবারের সাথে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পেয়ারা, আমলকী, লেবু জাতীয় ফল, কমলা, টমেটো বা ক্যাপসিকামের মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারগুলো আয়রন শোষণের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, পৃথিবীতে এমন কোনো জাদুকরী খাবার নেই যা এক রাতের মধ্যে ডেঙ্গুর পর চুল পড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা শরীরে কোনো ঘাটতি আছে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে উচ্চ মাত্রার আয়রন, বায়োটিন, জিঙ্ক বা ভিটামিন ডি যুক্ত বিভিন্ন বাজারজাত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
বেশি গ্রহণ করলেই যে সবসময় ভালো ফল মিলবে তা নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যান্য পরীক্ষানিরীক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরবর্তী সময়ে চুলের বাহ্যিক যত্নের প্রতিও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন যে চুল ধুলে বা শ্যাম্পু করলে চুল বেশি পড়ে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
শ্যাম্পু করার কারণে নতুন করে কোনো চুল ঝরে পড়ে না, বরং যে চুলগুলো গোড়া থেকে আগেই আলগা হয়ে ঝরে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল, শ্যাম্পু কেবল সেগুলোকে ঝরে পড়তে সাহায্য করে। তাই ডেঙ্গুর পরেও রোগীরা স্বাভাবিক নিয়মে চুল ধোয়া চালিয়ে যেতে পারেন। তবে এই সময়ে চুলের প্রতি অনেক বেশি সদয় হতে হবে।
বিশেষ করে চুল যখন ভেজা থাকে, তখন তা খুব আলতোভাবে নাড়াচাড়া করা বাঞ্ছনীয়। তোয়ালে দিয়ে জোরে জোরে ঘষে চুল মোছা, অতিরিক্ত তাপ উৎপন্নকারী যন্ত্রের ব্যবহার, ঘন ঘন রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট এবং খুব শক্ত করে বা আঁটসাঁট করে চুল বেঁধে রাখার মতো অভ্যাসগুলো পরিহার করা উচিত।
এগুলো চুল ভাঙা বাড়িয়ে দেয় এবং পাতলা চুলকে আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যায়। পরিশেষে, ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কোনো ধরণের ক্র্যাশ ডায়েটিং এই সময়ে শরীরের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সংক্রমণের পর শরীরের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুনরায় শক্তিশালী করতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার এবং শক্তির প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মে ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়া শরীরকে সার্বিকভাবে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
যদিও এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোর কোনোটিই তাৎক্ষণিকভাবে চুলের বৃদ্ধিকে জাদুকরীভাবে ফিরিয়ে আনবে না, তবে এগুলো চুল পুনরায় গজানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। এত কিছুর পরেও যদি চুল পড়ার হার স্বাভাবিক না হয়, তবে অবশ্যই কালক্ষেপণ না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।