রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব শারীরিক সতর্ক সংকেতে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করবেন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব শারীরিক সতর্ক সংকেতে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করবেন
ছবি : Collected

মাতৃত্বকালীন সময়টি একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল, আনন্দময় এবং একই সঙ্গে শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং একটি অধ্যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পুরোনো ধারণাকে বাতিল করে নিয়মিত এবং পরিমিত শারীরিক পরিশ্রমের ওপর জোর দেয়।

 

যদি গর্ভাবস্থা সম্পূর্ণ জটিলতামুক্ত থাকে এবং চিকিৎসকের তরফ থেকে কোনো বিশেষ বিধিনিষেধ না থাকে, তবে ব্যায়াম বা শরীরচর্চা হবু মায়ের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। নিয়মিত হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার হাঁটাচলা, নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার কাটা, প্রসবপূর্ব বিশেষ যোগব্যায়াম এবং অন্যান্য পরিমিত শারীরিক কার্যকলাপ গর্ভাবস্থায় মায়ের ফিটনেস বজায় রাখার পাশাপাশি সার্বিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

 

তবে গর্ভাবস্থায় শারীরিক পরিশ্রমের প্রতি মানবদেহের প্রতিক্রিয়া সাধারণ সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। এই সময়ে শরীরের ভেতরে নানা ধরনের হরমোনজনিত ও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে। তাই শরীরচর্চার সময় কিছু নির্দিষ্ট অস্বস্তি স্বাভাবিক হলেও, এমন কিছু বিশেষ সতর্ক সংকেত রয়েছে যেগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে অবিলম্বে ব্যায়াম বন্ধ করা অপরিহার্য।

 

এই সংকেতগুলো মূলত শরীরের নিজস্ব সতর্কতা ব্যবস্থা, যা কোনো আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস দেয়। ব্যায়াম করার সময় আপনি কতটা ক্লান্ত বোধ করছেন সেটি মূল বিষয় নয়, বরং আপনার শরীর এমন কোনো অস্বাভাবিক সংকেত দিচ্ছে কি না, যা মা ও অনাগত সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটি শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা চলাকালীন বা ব্যায়াম শেষ করার পরপরই যদি যোনিপথে সামান্যতম রক্তপাত বা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ লক্ষ্য করা যায়, তবে এটিকে কোনোভাবেই ব্যায়ামজনিত সাধারণ ক্লান্তি বা অস্বস্তি হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর চিকিৎসাবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে।

 

যোনিপথ দিয়ে হঠাৎ তরল নিঃসরণ মাতৃগর্ভের অ্যামনিওটিক থলি বা ঝিল্লি অকালে ফেটে যাওয়ার একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ হতে পারে, যা অনাগত শিশুর সুরক্ষার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রথিতযশা চিকিৎসা সংস্থা ‘আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস’ গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা বন্ধ করার জন্য যেসব অত্যন্ত জরুরি ও সতর্কীকরণ চিহ্ন নির্ধারণ করেছে, তার মধ্যে যোনিপথে রক্তপাত এবং তরল নিঃসরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

 

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যায়াম বন্ধ করতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রসূতি বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এর পাশাপাশি শরীরচর্চার সময় মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিকভাবে মাথা হালকা অনুভূত হওয়া কিংবা হঠাৎ করে জ্ঞান হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সংকেত।

 

শারীরিক পরিশ্রমের পর সামান্য ক্লান্তি আসাটা মানবদেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং রক্তনালীগুলো প্রসারিত থাকে। ব্যায়াম করার সময় রক্তচাপ এবং রক্তপ্রবাহের এই পরিবর্তনশীল গতিশীলতায় আরও বেশি মাত্রায় প্রভাব পড়ে।

 

এই অবস্থায় জ্ঞান হারানোর অনুভূতি হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ জোরপূর্বক ব্যায়াম চালিয়ে যান, তবে হঠাৎ করে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। গর্ভাবস্থায় যেকোনো ধরনের পতন মাতৃজঠরে থাকা শিশুর জন্য ভয়াবহ আঘাতের কারণ হতে পারে।

 

তাই মাথা ঘোরার অনুভূতি হলে তৎক্ষণাৎ শারীরিক কার্যকলাপ থামিয়ে নিরাপদ কোনো স্থানে বসে বা শুয়ে পড়া উচিত। শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে এই উপসর্গগুলো শান্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যদি এই মাথা ঘোরার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তীব্র আকার ধারণ করে অথবা ব্যায়াম করার সময় বারবার ফিরে আসে, তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

 

ব্যায়াম করার সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার সময় যত এগোতে থাকে এবং মাতৃগর্ভ যখন ক্রমশ বড় হতে থাকে, তখন ফুসফুস ও ডায়াফ্রামের ওপর একধরনের প্রাকৃতিক চাপ সৃষ্টি হয়।

 

এর ফলে হালকা শারীরিক পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট অনুভূত হতে পারে। তবে এই স্বাভাবিক শ্বাসকষ্টের বাইরে গিয়ে যদি হঠাৎ করে তীব্র ও অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তবে তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া সমীচীন নয়।

 

এর সঙ্গে যদি বুকে কোনো ধরনের ব্যথা অনুভূত হয়, তবে সেটি হৃদযন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্রের কোনো গভীর সমস্যার সুস্পষ্ট সতর্ক সংকেত হতে পারে। এই ধরনের গুরুতর উপসর্গগুলোর পেছনে নানাবিধ জটিল শারীরিক কারণ থাকতে পারে, তাই এগুলোকে নিছক গর্ভাবস্থার সাধারণ দুর্বলতা বলে উড়িয়ে দেওয়া চরম বোকামি এবং বিপজ্জনক হতে পারে।

 

গর্ভাবস্থায় মায়েদের পেট মাঝে মাঝে শক্ত হয়ে আসা বা হালকা সংকোচন অনুভূত হওয়া একটি পরিচিত শারীরিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ব্যায়াম করার সময় যদি এই সংকোচন অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়, ক্রমশ ঘন ঘন হতে থাকে বা একটি নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসে, তবে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

 

শরীরচর্চা বন্ধ করে পরিপূর্ণ বিশ্রামে যাওয়ার পরও যদি এই বেদনাদায়ক সংকোচন অব্যাহত থাকে বা এর তীব্রতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে বিলম্ব না করে প্রসূতি বিভাগে যোগাযোগ করা অপরিহার্য।

 

বিশেষ করে গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে এ ধরনের নিয়মিত সংকোচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি অকাল প্রসবের একটি শক্তিশালী পূর্বলক্ষণ হতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় পরিমিত মাত্রার ব্যায়াম নিজে থেকে কখনো অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায় না।

 

২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যালোচনায় মোট ৫৭টি বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, গর্ভাবস্থায় মাঝারি ধরনের শরীরচর্চার সঙ্গে গর্ভকালীন বয়স কমে যাওয়া বা অকাল প্রসবের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সঠিক নিয়ম মেনে ব্যায়াম করা মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

 

তবে অস্বাভাবিক সংকোচনকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না। অনাগত শিশুর নড়াচড়া বা মুভমেন্ট হলো তার সুস্থতার সবচেয়ে বড় নির্দেশক। গর্ভাবস্থার সময় সামনের দিকে এগোতে থাকলে মায়ের কাছে তার শিশুর নড়াচড়ার একটি নির্দিষ্ট ধরন ও সময়কাল অত্যন্ত পরিচিত হয়ে ওঠে।

 

ব্যায়াম করার সময় বা এর ঠিক পরপরই যদি কোনো মা হঠাৎ লক্ষ্য করেন যে তার শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়া উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে বা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তবে এটি একটি চরম সতর্ক সংকেত। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, মায়ের ব্যায়ামের কারণে ক্লান্ত হয়ে শিশুটি হয়তো পেটের ভেতরে বিশ্রাম নিচ্ছে।

 

এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এমন পরিস্থিতি টের পেলে অবিলম্বে সমস্ত শারীরিক কার্যকলাপ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে শিশুর নড়াচড়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। যদি দীর্ঘ সময় ধরে নড়াচড়া লক্ষণীয়ভাবে কম থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে।

 

নড়াচড়া নিজে থেকে ফিরে আসে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। সর্বোপরি, শরীরচর্চার সময় হঠাৎ করে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে সেটিকে কেবল সাধারণ পানিশূন্যতা বা শারীরিক ক্লান্তি বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

 

এর পাশাপাশি মুখমণ্ডল বা হাতের আঙুলে হঠাৎ করে অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দেওয়া, দৃষ্টিশক্তিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা ঝাপসা দেখা, পেটের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো লক্ষণগুলো দেখা দিলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলো ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’ নামক একটি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী গর্ভকালীন জটিলতার সুস্পষ্ট সতর্কীকরণ চিহ্ন। এই পরিস্থিতি মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

তাই গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা করার ক্ষেত্রে সুস্থতা ও সচেতনতার মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। যেকোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে এবং এ ধরনের কোনো সতর্ক সংকেত দেখা দিলে চিকিৎসকের সুপরামর্শ গ্রহণ করাই হলো নিরাপদ মাতৃত্বের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।