সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রসুনের আশ্চর্য ঔষধি গুণ, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাফল্য

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

রসুনের আশ্চর্য ঔষধি গুণ, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাফল্য
ছবি: সংগৃহীত

মানব সভ্যতার উন্মেষের পর থেকেই প্রাকৃতিক চিকিৎসায় নানা ধরনের ভেষজ উপাদানের ব্যবহার হয়ে আসছে, যার মধ্যে রসুন অন্যতম প্রধান একটি নাম। প্রাচীনকালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ রসুনের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং এর শক্তিশালী ঔষধি গুণের কারণে একে দৈনন্দিন জীবনযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

 

সে সময়কার চিকিৎসকেরা রসুনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলেও, এর রোগ নিরাময় ক্ষমতা সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির যুগে এসে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণাগারে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, রসুনের এই অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারিতার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এর রাসায়নিক গঠনের মধ্যে।

 

বিশেষ করে যখন রসুনের কোয়া কাটা হয়, থেঁতো করা হয় অথবা চিবানো হয়, তখন এর মধ্যে এক ধরনের বিশেষ সালফার যৌগ গঠিত হয়, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে।

 

রসুনের মধ্যে থাকা এই জাদুকরী যৌগগুলোর মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে সুপরিচিত এবং বহুল আলোচিত যৌগটির নাম হলো অ্যালিসিন। তবে রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যালিসিন অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং অস্থিতিশীল একটি যৌগ।

 

এটি রসুনের স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না, বরং তাজা রসুন কাটার বা থেঁতো করার পর কেবলমাত্র খুব অল্প সময়ের জন্যই এটি কার্যকর অবস্থায় উপস্থিত থাকে। এরপর এটি অন্যান্য যৌগে রূপান্তরিত হয়ে যায়। অ্যালিসিন ছাড়াও রসুনের স্বাস্থ্য উপকারিতায় অসামান্য অবদান রাখতে পারে এমন আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যৌগ বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে।

 

এর মধ্যে ডায়ালিল ডিসালফাইড এবং এস-অ্যালিল সিস্টেইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যখন কোনো মানুষ রসুন গ্রহণ করেন, তখন এই শক্তিশালী সালফার যৌগগুলো পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে।

 

পরিপাক প্রক্রিয়া শেষে এগুলো রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেহের প্রতিটি কোষে শক্তিশালী জৈবিক ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যা শরীরকে নানা ধরনের জটিল রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখে।

 

পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ক্যালোরির হিসাবের দিক থেকে রসুন অবিশ্বাস্য রকমের পুষ্টিকর একটি উপাদান। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান বা স্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করেন, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ খাবার।

 

বিশ্বস্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এক কোয়া বা প্রায় তিন গ্রাম ওজনের রসুনে মাত্র সাড়ে চার ক্যালোরি শক্তি থাকে। এর পাশাপাশি এতে থাকে শূন্য দশমিক দুই গ্রাম প্রোটিন এবং এক গ্রাম কার্বোহাইড্রেট। ক্যালোরির পরিমাণ এত কম হওয়া সত্ত্বেও রসুন মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের একটি চমৎকার উৎস হিসেবে কাজ করে।

 

নিয়মিত রসুন গ্রহণের মাধ্যমে শরীর ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন সি, সেলেনিয়াম এবং ফাইবারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো পেয়ে থাকে। এছাড়াও রসুনে আরও বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও পুষ্টি উপাদানের সামান্য পরিমাণ উপস্থিতি রয়েছে, যা সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে নীরব কিন্তু কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

 

বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তিত আবহাওয়া এবং পরিবেশ দূষণের কারণে সাধারণ সর্দিকাশিসহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক অসুস্থতা মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের সাধারণ কিন্তু বিরক্তিকর অসুস্থতা থেকে শরীরকে রক্ষা করতে রসুনের ভূমিকা নিয়ে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।

 

২০১৬ সালে প্রকাশিত এমনই একটি যুগান্তকারী গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ‘এজড গার্লিক এক্সট্র্যাক্ট’ বা দীর্ঘদিনের পুরোনো রসুনের নির্যাস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম।

 

এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাটিতে অংশগ্রহণকারীদের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখা গেছে যে, যারা শীতকাল বা ঠান্ডা ও ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের মৌসুমে টানা তিন মাস ধরে এই রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার উপসর্গগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম গুরুতর ছিল।

 

শুধু তাই নয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ার কারণে স্কুল, কলেজ বা কর্মক্ষেত্র থেকে তাদের অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতির দিনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যান্য সমসাময়িক গবেষণাগুলো থেকে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায় যে, রসুনে বিদ্যমান যৌগগুলোর মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল বা ভাইরাস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

 

মানবদেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি, রসুন সরাসরি ভাইরাসের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে সক্ষম। যখন কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস শরীরে আক্রমণ করার চেষ্টা করে, তখন রসুনের এই সক্রিয় উপাদানগুলো ভাইরাসটিকে মানবদেহের সুস্থ কোষে প্রবেশ করতে প্রবলভাবে বাধা প্রদান করে।

 

এমনকি কোনো ভাইরাস যদি কোষে প্রবেশ করেও ফেলে, তবুও রসুনের যৌগগুলো সেই কোষের ভেতরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াকে শ্লথ বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীর খুব সহজেই যেকোনো ভাইরাল সংক্রমণকে পরাস্ত করে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক হৃদরোগ। অন্য যেকোনো শারীরিক জটিলতা বা মহামারির চেয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি।

 

চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হলো এমন একটি নীরব ঘাতক, যা মানুষকে ধীরে ধীরে এই ধরনের ভয়াবহ হৃদরোগের দিকে পরিচালিত করে। ২০২০ সালে বিশ্বস্ত চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে রসুনের সাপ্লিমেন্ট জাদুর মতো কাজ করে।

 

এটি প্রাকৃতিকভাবে এবং অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে রক্তচাপ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। গবেষকরা তাদের বিশ্লেষণে প্রমাণ পেয়েছেন যে, নিয়মিত রসুন গ্রহণের ফলে কার্ডিওভাসকুলার ইভেন্ট বা হৃদরোগজনিত আকস্মিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি ১৬ শতাংশ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রসুনের প্রভাব প্রচলিত কিছু অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের মতোই শক্তিশালী, কিন্তু রাসায়নিক ওষুধের মতো এর কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

 

এর আগে ২০১৯ সালে পরিচালিত আরেকটি নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় রসুনের এই রক্তচাপ কমানোর পেছনের মূল কারণটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রসুনে থাকা অ্যালিসিন নামক জাদুকরী উপাদানটি মানবদেহে ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-২’ নামক একটি বিশেষ হরমোনের উৎপাদনকে সীমিত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

 

মূলত এই হরমোনটিই মানুষের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে দিয়ে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী। অ্যালিসিন এই ক্ষতিকর হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রক্তনালীগুলোকে শিথিল ও প্রসারিত করতে সাহায্য করে।

 

এর ফলে হৃৎপিণ্ডকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় না এবং সারা শরীরে রক্ত অত্যন্ত সহজে ও স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এক পরম স্বস্তির বিষয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও রসুন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

 

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গবেষণা পর্যালোচনা অনুযায়ী, রসুন মানুষের রক্তে থাকা মোট কোলেস্টেরল এবং বিশেষ করে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সক্ষম।

 

এই গবেষণার ভিত্তিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় বেশি করে রসুন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই ফলাফলগুলোকে চিকিৎসাক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

 

এর আগে ২০১৬ সালের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি দুই মাসের বেশি সময় ধরে নিয়মিত রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন, তবে তার রক্তে থাকা ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গবেষকরা মূলত সেই সব মানুষের মধ্যে এই ইতিবাচক প্রভাবটি লক্ষ্য করেছেন, যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি ছিল।

 

তবে বিজ্ঞান তার নিজস্ব বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বচ্ছতার জায়গা থেকে রসুনের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও অকপটে স্বীকার করেছে। রক্তে থাকা ট্রাইগ্লিসারাইড হলো হৃদরোগের জন্য দায়ী আরেকটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান।

 

একাধিক গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে যে, এলডিএল কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষেত্রে রসুনের চমৎকার প্রভাব থাকলেও, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রার ওপর এটি তেমন কোনো কার্যকরী প্রভাব ফেলতে পারে না।

 

শুধু তাই নয়, ওই একই গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, রক্তে থাকা এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রেও রসুনের কোনো সরাসরি ভূমিকা নেই। তা সত্ত্বেও, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রসুন সামগ্রিকভাবে মানবদেহের যে অপরিসীম উপকার সাধন করে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই দৈনন্দিন জীবনে পরিমিত মাত্রায় রসুন গ্রহণের অভ্যাস একটি সুস্থ, সুন্দর ও নীরোগ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে।