অনেক দম্পতি এই শূন্যতা পূরণের জন্য যত দ্রুত সম্ভব আবারও মা-বাবা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, আবার অনেকেরই এই গভীর মানসিক ও শারীরিক ক্ষত থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নতুন করে গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার আগে অনেক দম্পতিকেই অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার কোনো বৈজ্ঞানিক বা প্রমাণভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা নেই। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা রুটিন অনুসরণ করার চেয়ে বরং একজন নারীর শারীরিক পুনরুদ্ধার, মানসিক প্রস্তুতি এবং পূর্ববর্তী গর্ভপাতের অন্তর্নিহিত কারণগুলো বিশ্লেষণ করাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
গর্ভপাতের পর অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করার এই পরামর্শটি চিকিৎসাক্ষেত্রে বহু বছর ধরেই একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিরতির সুপারিশ করেছিল।
এর পেছনে তাদের মূল যুক্তি ছিল, পর্যাপ্ত বিরতি না দিলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় মাতৃমৃত্যু বা ভ্রূণের নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং প্রস্তুত বোধ করলে অনেক নারী প্রথম স্বাভাবিক মাসিকের পরপরই পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘পিএলওএস মেডিসিন’-এ ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই পুরোনো সুপারিশকে প্রবলভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। নরওয়েতে পরিচালিত এই বৃহৎ পরিসরের গবেষণায় গর্ভপাতের পর জন্মগ্রহণ করা প্রায় উনপঞ্চাশ হাজার আটান্নটি শিশুর জন্মগত তথ্য এবং মাতৃস্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি এই নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর গবেষকরা এই চূড়ান্ত উপসংহারে পৌঁছান যে, গর্ভপাতের মাত্র তিন মাসের মধ্যে কোনো নারী যদি পুনরায় গর্ভধারণ করেন, তবে গর্ভাবস্থায় নতুন করে কোনো গুরুতর প্রতিকূল পরিস্থিতি বা শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে না।
নরওয়ের এই বিস্তৃত গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, গর্ভপাতের পর অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করার যে বর্তমান আন্তর্জাতিক সুপারিশ রয়েছে, আধুনিক চিকিৎসা পরিসংখ্যানে তার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।
তবে এই গবেষণার অর্থ এই নয় যে, যেকোনো দম্পতিকে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা না করেই আরেকটি সন্তান ধারণের জন্য তাড়াহুড়ো করতে হবে। মূলত ওই গবেষণাটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের সুস্থতা এবং গর্ভাবস্থার চূড়ান্ত ফলাফলগুলো খতিয়ে দেখেছে।
কিন্তু এটি মানুষের সামগ্রিক প্রজনন ক্ষমতা বা পুনরায় আরেকটি গর্ভপাতের ঝুঁকির মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর প্রতিটি প্রশ্নের সার্বিক উত্তর দিতে পারে না। তাই গর্ভপাতের পর ঠিক কখন আবার চেষ্টা করা নিরাপদ হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্ববর্তী গর্ভপাতটি কীভাবে সামলানো হয়েছিল এবং সেই সময়ে মাতৃদেহে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা দেখা দিয়েছিল কি না, তার ওপর।
প্রতিটি নারীর শারীরিক গঠন, সহ্যক্ষমতা এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শও ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তিত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, গর্ভাবস্থার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যদি কোনো জটিলতা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে গর্ভপাত হয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত রক্তপাত বা অন্যান্য উপসর্গগুলো পুরোপুরি কমে যাওয়ার পর নারী যখন নিজেকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত মনে করবেন, তখনই তারা পুনরায় সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
কিন্তু যদি ‘ডাইলেশন অ্যান্ড কিউরেটেজ’ বা অন্য কোনো অস্ত্রোপচার পদ্ধতির মাধ্যমে জরায়ু পরিষ্কার করতে হয়, তবে পুনরায় গর্ভধারণের আগে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফলো-আপ পরীক্ষা করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে বা মাঝামাঝি সময়ে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে, তবে শরীরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তুলনামূলকভাবে বেশ কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। একটোপিক প্রেগন্যান্সির মতো মারাত্মক জটিলতার ক্ষেত্রে একজন নারী কী ধরনের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী গর্ভধারণের বিরতির সময়কাল নির্ধারিত হয়।
এছাড়া মোলার প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রে মাতৃদেহে নির্দিষ্ট হরমোনের মাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসা পর্যন্ত নিয়মিত ডাক্তারি পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। পাশাপাশি গর্ভপাতের কারণে যদি কোনো গুরুতর সংক্রমণ বা মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাতের ঘটনা ঘটে, তবে সবার আগে সেই চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে হবে এবং পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে নারী পুরোপুরি সুস্থ ও ঝুঁকিমুক্ত হয়েছেন।
পুনরায় সন্তান ধারণের চেষ্টার আগে প্রথম স্বাভাবিক মাসিক বা পিরিয়ড পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত কি না, সেটি নিয়েও অনেক দম্পতির মনে নানা প্রশ্ন থাকে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম মাসিকের জন্য অপেক্ষা করলে পরবর্তী গর্ভাবস্থার সঠিক সময় ও প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ গণনা করা চিকিৎসকদের জন্য অনেক সহজ হয়।
মূলত এই একটি মাত্র ব্যবহারিক কারণেই অনেক চিকিৎসক অন্তত প্রথম পিরিয়ড পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর এটি কোনো সার্বজনীন বা বাধ্যতামূলক সুরক্ষামূলক নিয়ম নয়।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার নির্দেশিকা অনুসারে, শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকলে এবং শারীরিক অস্বস্তির উপসর্গগুলো সম্পূর্ণ কমে গেলে যে কোনো সময়েই গর্ভধারণের চেষ্টা করা যেতে পারে। সাধারণত গর্ভপাতের পর মাসিক ফিরে আসতে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং মাসিক চক্র পুনরায় সম্পূর্ণ নিয়মিত হতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
তবে আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেছে, যা অনেকেই না জেনে এড়িয়ে যান। সংস্থাটির মতে, প্রথম পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগেই নারীর শরীরে ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক গর্ভপাতের মাত্র দুই সপ্তাহ পরই এমনটা ঘটতে পারে। তাই কোনো দম্পতি যদি মানসিক বা শারীরিকভাবে প্রস্তুত না হওয়ার কারণে এখনই পুনরায় গর্ভধারণ করতে না চান, তবে তাদের অবশ্যই কার্যকরী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়া গর্ভপাতের পর বেশ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত রক্তে হরমোনের মাত্রা বেশি থাকার কারণে প্রেগন্যান্সি টেস্টের ফলাফল পজিটিভ আসতে পারে, তাই এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
শারীরিক সুস্থতা অর্জন করার মানেই এই নয় যে একজন নারী নতুন করে আরেকটি গর্ভধারণের জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। গর্ভপাতের মতো একটি গভীর ট্রমা বা মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠা মোটেও সহজ কাজ নয়।
কিছু নারী এই গভীর শোক ভুলতে অতি দ্রুত পুনরায় মা হওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, আবার অনেকের ক্ষেত্রে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাতের অবচেতন ভয় এবং মানসিক উদ্বেগ নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথকে অনেক বেশি কঠিন করে তোলে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি এই মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। পুনরায় চেষ্টা করার আগে দম্পতিদের খুব গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত যে তারা দুজনেই পরবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সমানভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন কি না।
রক্তপাত বা শারীরিক ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের মানসিক উদ্বেগগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। যখন শোক বা হতাশা ফিরে আসবে, তখন একে অপরকে মানসিক সমর্থন দেওয়ার মতো সহনশীলতা থাকাটা সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য অপরিহার্য।
পুনরায় সন্তান ধারণের চেষ্টা করার আগে পূর্বের শোক বা দুঃখবোধ পুরোপুরি মুছে ফেলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মানুষের মনে নতুন জীবনের অদম্য আশা এবং হারানোর অমূলক উদ্বেগ একই সঙ্গে বিরাজ করতে পারে, আর এই স্বাভাবিক মিশ্র অনুভূতিগুলোকে সঙ্গী করেই সঠিক সময়ে চিকিৎসকের নিবিড় পরামর্শে নতুন করে পথ চলা শুরু করা যায়।