তবে আধুনিক বিশ্বে যখন ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগের মতো বিপাকীয় স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো প্রায় মহামারির আকার ধারণ করেছে, তখন প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মানুষের মনে নানা ধরনের উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।
ডায়াবেটিস নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তিদের প্রায়শই চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদদের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ পরামর্শ দেওয়া হয়, আর তা হলো-নিয়মিত খাদ্যতালিকায় সাদা ভাতের পরিবর্তে লাল চালের ভাত অন্তর্ভুক্ত করা।
এই পরামর্শের মূল ভিত্তি হলো লাল চালে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার বা খাদ্যআঁশ। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়, লাল চালের ভাত খাওয়া মানেই কি তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা প্রদান করে?
লাল চালে তুলনামূলকভাবে বেশি ফাইবার থাকে এটি একটি প্রমাণিত সত্য, তবে কোনো চালই এককভাবে রক্তে গ্লুকোজের উন্নত নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত বা শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল খাবারের ধরন নয়, বরং খাবারের পরিমাণ, অন্যান্য উপাদানের সংমিশ্রণ এবং ব্যক্তির নিজস্ব শারীরিক অবস্থা বা বিপাকীয় হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যারা তাদের দৈনন্দিন কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা গ্রহণের গুণগত মান উন্নত করতে চান, তাদের জন্য লাল চালের ভাত সাধারণত একটি চমৎকার স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রধান কারণ হলো, চাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় লাল চালের উপরের তুষের স্তরটি অক্ষুণ্ণ থাকে, যা মানবদেহে অনেক বেশি পরিমাণে ফাইবার বা খাদ্যআঁশ সরবরাহ করে।
ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে শর্করা ধীরে ধীরে রক্তে মেশে। তবে এই প্রক্রিয়াটি কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ রোধ করতে পারে না। মনে রাখতে হবে, লাল এবং সাদা উভয় ধরনের চালেই কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা বিদ্যমান থাকে।
তাই আপনি কোন চালের ভাত খাচ্ছেন তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কী পরিমাণ ভাত খাচ্ছেন এবং সেই ভাতের সাথে অন্যান্য পুষ্টি উপাদান কীভাবে সমন্বয় করছেন। এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলগুলো বেশ চমকপ্রদ।
২০২১ সালে সুপরিচিত বিজ্ঞান সাময়িকী 'পিয়ারজে' (PeerJ)-তে প্রকাশিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় প্রিডায়াবেটিস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে সাদা ভাতের বদলে ব্রাউন রাইস বা লাল চাল খাওয়ার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের পর ওই গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে, রোগীদের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় সাদা ভাতের পরিবর্তে লাল চালের ভাত অন্তর্ভুক্ত করার ফলে খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বা এইচবিএওয়ানসি (HbA1c)-এর মাত্রায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বা যুগান্তকারী উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি।
উল্লেখ্য, এইচবিএওয়ানসি হলো গত তিন মাসে মানুষের রক্তে শর্করার গড় পরিমাপ নির্ধারণের একটি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি। এই প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র চাল পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপসংহারে পৌঁছানোর আগে আরও উন্নতমানের এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিক্যাল গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে এই গবেষণার অর্থ এই নয় যে, লাল চালের নিজস্ব কোনো পুষ্টিগুণ নেই বা এটি স্বাস্থ্যকর নয়। লাল চাল অবশ্যই পুষ্টিসমৃদ্ধ, তবে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য উন্নতি আনার জন্য শুধুমাত্র সাদা চালের বদলে লাল চাল খাওয়াই যথেষ্ট না-ও হতে পারে।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির সাথে সাদা ভাতের সম্পর্ক নিয়েও চিকিৎসা জগতে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন সাদা ভাত খেলেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সরাসরি বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে বেশি পরিমাণে এবং ঘন ঘন সাদা ভাত খাওয়া, বিশেষ করে কম খাদ্যআঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
২০২২ সালে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান জার্নাল 'বিএমজে ওপেন' (BMJ Open)-এ প্রকাশিত একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় ভাত খাওয়া এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে পরিচালিত অসংখ্য পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
ওই পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতিরিক্ত মাত্রায় সাদা ভাত খাওয়ার সাথে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি যোগসূত্র রয়েছে, অন্যদিকে লাল চাল খাওয়ার সাথে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে হ্রাসের একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
ট্রায়াল চলাকালীন রোগীদের লাল চাল খাওয়া শুরু করার পর তাদের কার্ডিওমেটাবলিক মার্কার বা হৃদরোগ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সূচকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কোনো বড় ধরনের উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি।
এই গবেষণাগুলো মূলত খাদ্যাভ্যাস ও রোগের মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্দেশ করে, কিন্তু এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে না যে সাদা ভাত খাওয়া সরাসরি ডায়াবেটিস সৃষ্টির জন্য এককভাবে দায়ী। একজন মানুষের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বা ব্যায়ামের মাত্রা, জিনগত বা বংশগত কারণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যগত বিষয়ও এই বিপাকীয় রোগটির ঝুঁকির ওপর সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
এখন প্রশ্ন হলো, ডায়াবেটিস থাকলে একজন মানুষের ঠিক কতটা ভাত খাওয়া উচিত? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো নির্দিষ্ট ও সর্বজনীন পরিমাণের কথা উল্লেখ নেই যা সব রোগীর জন্য সমানভাবে উপযুক্ত হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের ভাত খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বা ভাত নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
বরং তাদের উচিত খাবারের পরিমাণের দিকে কড়া নজর রাখা এবং ভাতের সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন বা আমিষ এবং শাকসবজি যুক্ত করে আহারের একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখা। খাদ্যাভ্যাসে কিছু বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আনার মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীরা অনায়াসেই ভাত উপভোগ করতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ, খাবার গ্রহণের সময় প্লেটের বেশিরভাগ অংশ যেন শুধুমাত্র ভাত দিয়ে পূর্ণ না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পুষ্টিবিদরা ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাল, শিম, ডিম, মাছ, চর্বিহীন মাংস, পনির বা অন্য যেকোনো স্বাস্থ্যকর আমিষের উৎস যুক্ত করার জোরালো পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
একইসাথে খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে শ্বেতসারবিহীন শাকসবজি যেমন পালং শাক, বাঁধাকপি, বিভিন্ন ধরনের শিম বা লাউয়ের মতো উপাদানগুলো বেশি করে রাখা উচিত। সর্বোপরি, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডায়াবেটিস নিয়ে কাজ করা শীর্ষ প্রতিষ্ঠান 'আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন' স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জন্য একটি বিশেষ 'প্লেট পদ্ধতি' বা থালা সাজানোর নিয়মের সুপারিশ করে থাকে।
এই পদ্ধতি অনুযায়ী, একজন ডায়াবেটিস রোগীর খাবারের প্লেটের অর্ধেক অংশজুড়ে থাকতে হবে শ্বেতসারবিহীন শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ অংশে থাকবে প্রোটিন বা আমিষজাতীয় খাবার এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ অংশে থাকবে ভাত বা অন্য যেকোনো শর্করাযুক্ত খাবার।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের যাত্রা শুরু করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত সূচনা হতে পারে, যদিও রোগীর বয়স, শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেকের পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
ভাত রান্নার পদ্ধতি ও সংরক্ষণের সাথেও রক্তে শর্করার মাত্রার একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞান বলছে, ভাত রান্না করার পর তা রেফ্রিজারেটরে ঠান্ডা করলে ভাতের রাসায়নিক গঠনে কিছুটা পরিবর্তন আসে এবং এতে 'প্রতিরোধী শ্বেতসার' বা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই প্রতিরোধী শ্বেতসার সাধারণ শ্বেতসারের চেয়ে সহজে হজম হয় না এবং এটি অনেকটা ফাইবারের মতো আচরণ করে পরিপাকতন্ত্রে ধীরে ধীরে শোষিত হয়। এর ফলে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি রক্তে গ্লুকোজের আকস্মিক বৃদ্ধি বা স্পাইক কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়ার প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং এটি মনে রাখা জরুরি যে, ভাত ঠান্ডা করলেই তা থেকে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাদুকরীভাবে উধাও হয়ে যায় না। তাই ঠান্ডা ভাতকে যথেচ্ছ বা অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার কোনো বিকল্প বা ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচনা করা মোটেও সমীচীন হবে না।
এছাড়া খাদ্য সুরক্ষার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। রান্না করা ভাত দীর্ঘ সময়ের জন্য সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিতে পারে। ভাত রান্না করার পর তা দ্রুত ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা এবং খাওয়ার আগে পুনরায় ভালোভাবে গরম করে নেওয়া খাদ্য সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ থাকলে রোগীদের তাদের প্রিয় খাবার সাদা ভাত খাওয়া চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সঠিক নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে সাদা ভাতও একটি সুষম খাদ্যের স্বাস্থ্যকর অংশ হতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে একটি উপযুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিমাণ বেছে নেওয়ার মধ্যে। ভাতের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং আঁশযুক্ত শাকসবজি যোগ করা এবং নিজের রক্তে গ্লুকোজের প্রতিক্রিয়া প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লাল চাল খাদ্যআঁশ বা ফাইবারের পরিমাণ বাড়াতে অবশ্যই একটি দারুণ সাহায্যকারী উপাদান হতে পারে, কিন্তু একটি সুষম খাদ্যতালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এটিই পৃথিবীর একমাত্র বিকল্প নয়। লাল চালের পাশাপাশি অন্যান্য গোটা শস্য বা হোল গ্রেইন, বিভিন্ন প্রকার ডাল এবং তাজা শাকসবজিও আপনার দৈনন্দিন খাদ্যের মান বহুগুণে উন্নত করতে পারে এবং ডায়াবেটিস নিয়েও একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।