শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কঙ্গোতে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের প্রাণহানি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

কঙ্গোতে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের প্রাণহানি
ছবি : Collected

আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় দেশটির সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ দুই জ্যেষ্ঠ জেনারেল কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সদস্যসহ অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

 

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কিকভিট থেকে রাজধানী কিনশাসার উদ্দেশে যাত্রা করা সামরিক বিমানটি উড্ডয়নকালে আকস্মিক কারিগরি জটিলতার সম্মুখীন হয় এবং মাঝপথে বিধ্বস্ত হয়। দেশের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও আইনবিষয়ক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের এই আকস্মিক বিয়োগে পুরো কঙ্গো জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনী দপ্তর থেকে শুক্রবার এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মর্মান্তিক এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তা, বিমানের নাবিক ও প্রতিনিধি দলের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে যাত্রা করা এই উড়োজাহাজটির কোনো আরোহীই শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার পাননি।

 

বিমান বিধ্বস্তের পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা থেকে কারো জীবিত উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তায় এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। উক্ত ভয়াবহ দুর্ঘটনায় জীবন উৎসর্গ করা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিচিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সামরিক আইন ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 

নিহতদের মধ্যে অন্যতম হলেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুতোম্বো কাটালাই তিয়েন্দে, যিনি দেশটির প্রধান সামরিক আদালতের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কঙ্গোর সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলারক্ষা ও সামরিক বিচার নিশ্চিতকরণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছিলেন।

 

একই সঙ্গে এই বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বাকুমি লিকুলিয়া, যিনি কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনীর অডিটর জেনারেল হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও কৌশলগত পদে আসীন ছিলেন।

 

এই দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক প্রশাসনিক কাঠামোর জন্যই এক চরম আঘাত নয়, বরং দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এটি এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ঘটনার মূল বিবরণ উল্লেখ করে সামরিক সূত্রে জানা গেছে যে, দুর্ঘটনাকবলিত বিশেষ বিমানটি কঙ্গোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র কিকভিট শহর থেকে তার নির্ধারিত যাত্রা শুরু করেছিল। বিমানে সেনা কর্মকর্তা, সরকারি প্রতিনিধি দল ও প্রয়োজনীয় ক্রু সদস্যসহ মোট ১৪ জন আরোহী অবস্থান করছিলেন।

 

কিকভিট থেকে বিমানটি রওনা দিয়ে রাজধানী কিনশাসার দিকে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু যাত্রাপথে কঙ্গোর কেঞ্জে এলাকার সীমানায় প্রবেশের পরপরই চালক দল উড়োজাহাজটিতে মারাত্মক ধরনের কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেন।

 

মুহূর্তের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি মাটির দিকে পতিত হয় এবং বিকট শব্দে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায় যে, কারিগরি ত্রুটি থেকে উৎপন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এতই দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে বিমান চালক দলের পক্ষে জরুরি অবতরণ করারও ন্যূনতম সময় ছিল না।

 

কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল এফোমি একেঙ্গে এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ মাধ্যমগুলোর সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে নিশ্চিত করেন যে, বিমানটিতে থাকা দুই জ্যেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট জেনারেল কর্মকর্তার সাথে তাদের সফরসঙ্গী ১২ জন প্রতিনিধি ও নাবিক দলের প্রত্যেক সদস্যই দুর্ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন।

 

মেজর জেনারেল একেঙ্গে আরও জানান যে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আসল উৎস এবং কোন নির্দিষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারাল, তা বিশদভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য ইতোমধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

উক্ত কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সমস্ত আলামত সংগ্রহ ও কারিগরি পর্যালোচনা সম্পন্ন করবে। কঙ্গোর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং সংস্থার চেয়ারম্যান ত্রিফোঁ কিন-কিয়ে মুলুম্বা ঘটনার সার্বিক প্রাথমিক মূল্যায়নে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।

 

তিনি জানান যে, যদিও প্রাথমিক বার্তাগুলোতে কারিগরি ত্রুটির সম্ভাবনা সামনে এসেছে, তবুও তদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নিশ্চিত ও প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

 

বিমান চলাচলের গতিপথ, রাডার যোগাযোগ, আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে তথ্য পুনরুদ্ধারের পর দুর্ঘটনার সুস্পষ্ট ছবি ফুটে উঠবে বলে তিনি ব্যক্ত করেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সামরিক বাহিনীর যৌথ সহায়তায় এই তদন্ত পরিচালনা করা হবে যাতে যেকোনো সম্ভাব্য অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড বা অবহেলার দিকটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা নিশ্চিত হয়।

 

ভৌগোলিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে কঙ্গোর এই বিমান দুর্ঘটনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এক সময়ে ঘটেছে। বর্তমানে দেশটি এক জটিল ও অস্থিতিশীল সামরিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে।

 

বিশেষ করে গত বছরের শুরু থেকেই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ও দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থান ও সহিংস তৎপরতা চরম আকার ধারণ করেছে। কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনী এক চরম প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন রক্তক্ষয়ী লড়াই পরিচালনা করছে।

 

বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র রুয়ান্ডার মদদপুষ্ট ও প্রত্যক্ষ সমর্থনপ্রাপ্ত এম২৩ নামের শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সাথে কঙ্গোর সেনাবাহিনীর যুদ্ধ দিন দিন তীব্রতর রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এম২৩ বিদ্রোহীদের একাধিক সমন্বিত হামলায় কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বাণিজ্যিক সড়ক সেনাবাহিনীর হাতছাড়া হয় এবং বিদ্রোহীরা সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

 

দেশের এমন এক সংকটময় সামরিক প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অডিট এবং বিচার বিভাগীয় প্রধানের মতো উচ্চপদস্থ দুজন জেনারেলের আকস্মিক প্রয়াণ কঙ্গো সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

 

সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সুসংগঠিত রাখার চলমান প্রক্রিয়ায় নিহত দুই জেনারেলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নিয়ামক।

 

এহেন পরিস্থিতিতে তাদের একযোগে আকস্মিক চলে যাওয়া সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন জটিলতার সৃষ্টি করবে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও এই দুর্ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে নতুন সামরিক নেতৃত্ব নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ভূখণ্ডের এই দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিমান চলাচলের ওপর জাতীয় নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং সুসংগঠিত সড়ক পথের তীব্র অভাব থাকায় দেশটির প্রশাসনিক, সামরিক ও বেসামরিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে আকাশপথ।

 

কিন্তু উন্নত রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার অভাব, পুরানো মডেলের উড়োজাহাজ ব্যবহার এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে কঙ্গোর আকাশসীমায় অতীতেও একাধিকবার ভয়াবহ ও মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনার নজির দেখা গেছে।

 

বর্তমান এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি পুনরায় দেশটির বিমান চলাচল নিরাপত্তা এবং সামরিক পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং এবিসি নিউজ কঙ্গো সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উদ্ধারকারী দলগুলোর বরাতে দুর্ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ ও জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের প্রতিনিধিরাও কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনীর এই বড় ধরনের ট্র্যাজেডিতে গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। সমগ্র দেশজুড়ে বর্তমানে এক গভীর জাতীয় শোকের আবহ বিরাজ করছে।

 

শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি কঙ্গো সরকার ও সেনাসদর দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার সকল তথ্য বিশদভাবে যাচাই-বাছাই করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এখন চোখ রাখছে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে, যা কেবল এই বিমান দুর্ঘটনার আসল সত্যই উন্মোচন করবে না, বরং আফ্রিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দেশটির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

 

- এবিসি নিউজ