বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২০ এএম

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেন ট্রাম্প
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে নিজের ভূমিকা তুলে ধরে আবারও মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি প্রশমনে তাঁর প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি মনে করেন, এই অর্জনের যথার্থ স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত।

 

তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে নরওয়ের নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করবে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে কমিটির ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক ধরনের তীক্ষ্ণ মন্তব্যও ছুড়ে দিয়েছেন এই মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান।

 

চলতি অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই নরওয়ের অসলো এবং সুইডেনের স্টকহোম থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে মানবকল্যাণে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গবেষকদের নাম ইতিমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিজয়ীর নাম আজ অসলো থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

 

ওভাল অফিসে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর স্বভাবসুলভ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

 

তিনি সরাসরি বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় তাঁর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর গভীরতা বিবেচনা করলে এই পুরস্কারটি তাঁরই প্রাপ্য। তবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির পক্ষপাতহীনতা নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি মন্তব্য করেন, তাঁর মতো প্রথাভাঙা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়ন না করার ব্যাপারে ওই কমিটির এক দীর্ঘ ও সুপরিচিত রেকর্ড রয়েছে।

 

ট্রাম্পের ভাষায়, বিশ্বমঞ্চে যাঁরা প্রচলিত কূটনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাস্তবমুখী সমাধান আনতে সচেষ্ট হন, তাঁদের অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে রাখা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসের মসনদে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই ট্রাম্প নিজেকে একজন বৈশ্বিক শান্তিদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তিনি প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরাম ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দাবি করে আসছেন যে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বিশ্বের বহু দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এর আগে প্রথম মেয়াদের সময়ও মধ্যপ্রাচ্যে কথিত আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষর এবং উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রত্যক্ষ আলোচনার পর তিনি নোবেল পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার বলে নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন।

 

সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মেয়াদেও শান্তি পুরস্কার নিয়ে তাঁর উচ্চাশা প্রকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তাঁর পররাষ্ট্রনীতির আত্মতুষ্টির একটি নিয়মিত বহিঃপ্রকাশ। গত বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্মৃতি রোমন্থন করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এদিন নিজের স্বপক্ষে আরও একটি চমকপ্রদ যুক্তি উপস্থাপন করেন।

 

গত বছর লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকামী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তিতে নোবেল জয় করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক পরপরই গত জানুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন সফরে এসে ওই ভেনেজুয়েলীয় রাজনীতিবিদ ট্রাম্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের নোবেল পদকটি প্রতীকী উপহার হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন।

 

ওভাল অফিসের আলোচনায় সেই ঘটনার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, পূর্ববর্তী বিজয়ী ব্যক্তি যখন অকপটে স্বীকার করেন যে আধুনিক ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি কেউ এই পুরস্কারের যোগ্য নয়, তখন বিষয়টি নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়েও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি বিশ্বের অন্তত আটটি জটিল ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সংঘাত সামাল দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর উপদেষ্টাদের একাংশের দাবি, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে এবং বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

 

কম্বোডিয়া, ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব ট্রাম্পকে এই বছরের শান্তি পুরস্কারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত করেছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে বিভিন্ন সময় জানানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন সংক্রান্ত নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করে না।

 

ফলে এসব দাবির আনুষ্ঠানিক সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন কোনো মাধ্যম থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনীতিবিদদের মূল্যায়ন একেবারেই ভিন্ন।

 

প্রেসিডেন্ট যেসব সংঘাত সমাধানের দাবি করছেন, সেসব অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ ওয়াশিংটনের একক কৃতিত্ব মানতে পুরোপুরি নারাজ। তাঁদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে সাময়িক লোকদেখানো সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা টেকসই শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না।

 

আফ্রিকার গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী বিরোধপূর্ণ এলাকায় ইতিমধ্যে নতুন করে সশস্ত্র উত্তেজনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা তথাকথিত সমঝোতার কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

 

বিশেষ করে ইউরোপের বুকে চলা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বারবার অঙ্গীকার করেছিলেন যে ক্ষমতায় বসার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তিনি মস্কো ও কিয়েভের সংঘাত স্থায়ীভাবে থামিয়ে দেবেন।

 

কিন্তু বাস্তবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর বহু মাস পার হয়ে গেলেও পূর্ব ইউরোপে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের কোনো অর্থবহ সমাধান সূত্র বের করতে পারেনি ওয়াশিংটন। বরং উভয় পক্ষের ওপর মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত কূটনৈতিক চাপ যুদ্ধ বন্ধের চেয়ে অনিশ্চয়তাকেই আরও ঘনীভূত করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ট্রাম্পের শান্তির দাবিকে আরও জটিল ও বিতর্কিত করে তুলেছে। গত কয়েক মাস ধরে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সামরিক ও অর্থনৈতিক আঘাতের পর পুরো অঞ্চলজুড়ে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে।

 

বিগত সাত মাস ধরে চলা এই অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে লাগামহীন হয়ে পড়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি এখন সরাসরি ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

আন্তর্জাতিক শান্তি ও কূটনীতি বিষয়ক গবেষকরা মনে করছেন, নরওয়ের নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত স্থায়ী কূটনীতি, মানবাধিকার রক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

 

ট্রাম্পের রাজনৈতিক চরিত্র, চরম জাতীয়তাবাদী পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক চুক্তি থেকে সরে আসার অতীত ইতিহাস বিবেচনায় নিলে নরওয়েজীয় কমিটির কাছ থেকে তাঁর এমন কোনো ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

 

কমিটির স্বাধীন মনোভাব ও ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষতার কারণে তারা কখনোই বৃহৎ পরাশক্তির রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে না। এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের দৌড়ে বিশ্বের অনেক নিবেদিতপ্রাণ শান্তিকামী ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকার কর্মী ট্রাম্পের তুলনায় বহুগুণ এগিয়ে রয়েছেন।

 

সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের পরম শ্রদ্ধেয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ লিও। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ মানবিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি গড়ে তোলার অনন্য উদ্যোগের কারণে তিনি বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছেন।

 

তাঁর পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও তৃণমূল পর্যায়ের অধিকারকর্মীর নামও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে আজ ওভাল অফিসের ব্রিফিং থেকে শুরু করে অসলোর আনুষ্ঠানিক মঞ্চ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর কৌতূহল বিরাজ করছে।

 

শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ট্রাম্পের নিজস্ব কূটনৈতিক দাবিগুলো যখন বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তব জটিলতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে, তখন নরওয়ের নোবেল কমিটি বিশ্বের সামগ্রিক অস্থিরতার মধ্যে শান্তির সঠিক দূত হিসেবে কার নাম ঘোষণা করে, এখন বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।