এই অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফলাফলের পর ট্রাম্পের দিক থেকে অসন্তোষ ও হতাশা যেমন প্রকাশ্যে এসেছে, ঠিক তেমনি বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের সাথে গঠনমূলক কাজ করার আগ্রহও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ারও একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছেন।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন যে, তিনি নিজে যদি সরাসরি নির্বাচনে প্রার্থী থাকতেন, তবে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করত।
এর কিছুদিন পর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সাথে একযোগে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
কিন্তু এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিখ্যাত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা স্লোগান লেখা লাল টুপির একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে স্লোগানের পরিবর্তে লেখা ছিল ‘ভেটো’।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি মূলত কংগ্রেসে পাস হওয়া যেকোনো আইন আটকে দেওয়ার যে সাংবিধানিক ক্ষমতা একজন প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে, সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পকে এখন ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতা হারাতে থাকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছেন।
মার্কিন রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘লেম ডাক’ শব্দটি সাধারণত এমন একজন প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাঁর কার্যকাল শেষের দিকে চলে এসেছে এবং পূর্বের তুলনায় যাঁর রাজনৈতিক প্রতাপ ও প্রভাব অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
সাধারণত, একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করা পর্যন্ত যে মধ্যবর্তী সময়টুকু থাকে, সেই সময়ে ক্ষমতায় আসীন প্রেসিডেন্টকে এই নামে ডাকা হয়। এই সময়টিতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত হয়ে আসে এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতে তাঁর প্রভাবও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই শব্দটির প্রয়োগ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এখনো দুই বছর পূর্ণ হতে বাকি রয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় বাকি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর যে একক আধিপত্য বা প্রভাব ছিল, তা বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এত দিন রিপাবলিকান পার্টি হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় থাকায় সরকারের আইন প্রণয়ন এবং বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কর্মসূচি বাস্তবায়নে ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন।
কিন্তু এখন যেহেতু ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নেতৃত্বের আসনে বসতে যাচ্ছে, সেহেতু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নিজেদের পছন্দের যেকোনো আইন বা নীতিমালা পাস করাতে গেলে বিরোধীদের শক্ত বাধার মুখে পড়তে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই পরাজয়কে অনেকেই ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন নীতি ও রাজনৈতিক কৌশলের প্রতি সাধারণ ভোটারদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। এই পরাজয়ের ফলে নিজ দলের আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের ওপর ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের যে সক্ষমতা ছিল, তা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
কারণ নির্বাচনী ফলাফলের পর রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল ও নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নানামুখী প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। তা ছাড়া, ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় হলো ২০২৯ সালের জানুয়ারি মাস।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নিজেদের ক্যারিয়ার বিবেচনা করে দলের অনেক নেতারাই তাঁর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগের মতো আগ্রহ না-ও দেখাতে পারেন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, মেয়াদের আরও দুই বছর বাকি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইতোমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছেন।
তবে ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট মানেই যে তিনি পুরোপুরিভাবে ক্ষমতাহীন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসেও অনেক প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের নীতিগত লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করেছেন।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এখনো বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা সংরক্ষিত রয়েছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের বাধার সম্মুখীন হলেও নির্বাহী আদেশ জারি করা, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা এবং ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ারগুলো ব্যবহারের সুযোগ তাঁর রয়েছে।
এর আগেও যখন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ছিল, তখনো আইন প্রণয়নের জটিল দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে তিনি বেশ কয়েকবার নির্বাহী আদেশের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের সাথে ট্রাম্পের তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে দেয়াল নির্মাণের জন্য তাঁর দাবিকৃত অর্থের চেয়ে কংগ্রেস অনেক কম বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি দেশব্যাপী জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণের জন্য অন্যান্য খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের একটি সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেস চাইলে একটি যৌথ প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে তা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে।
তবে প্রেসিডেন্ট সেই প্রস্তাবেও তাঁর ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। আর প্রেসিডেন্টের দেওয়া ভেটো অকার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-উভয় কক্ষেই উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও এককভাবে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ট্রাম্পের দেওয়া ভেটো বাতিল করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, বিরোধীদের প্রস্তাবিত আইনগুলো আটকে দিতে ট্রাম্প তাঁর এই ভেটো ক্ষমতাটি আরও বেশি ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের আনা সব ‘উন্মাদ’ আইন প্রণয়ন প্রস্তাবে তিনি নির্দ্বিধায় ভেটো দেবেন।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, কয়েক মাস ধরে এভাবেই ভেটো দেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা অনুধাবন করতে সক্ষম হবে যে এভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তখনই দুই পক্ষের মধ্যে একটি আপস ও সমঝোতা এবং একযোগে কাজ করার একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে বা কংগ্রেসে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি এবং সরাসরি নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ বিষয়গুলোতে তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জেমস বয়েজ আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনের এই ফলাফল নেতিবাচক হলেও এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কংগ্রেসের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
মার্কিন সংবিধান প্রেসিডেন্টকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ও বিস্তৃত ক্ষমতা প্রদান করেছে। ফলে মেয়াদের বাকি সময়ে ট্রাম্প হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বদলে পররাষ্ট্রনীতির দিকেই বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করবেন।
পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতিকেই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এর পাশাপাশি কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরী কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াও তিনি দক্ষতার সাথে এগিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, এ সময় তিনি নিজের বিতর্কিত স্বাস্থ্যসেবা আইন রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
একইভাবে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও তাঁর মেয়াদের শেষ দিকে পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের আয়োজন করে তিনি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী প্রচেষ্টা চালান।
এছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ক্লিনটন তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে প্রায় পাঁচ কোটি পঁচাশি লাখ একর বনভূমি সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও প্রায় অনুরূপ একটি পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
তিনি তাঁর ছেলেসহ পরিবারের সদস্যদের আগাম ক্ষমা ঘোষণা করা ছাড়াও ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন সরবরাহকৃত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার মতো বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে গ্রহণ করেছিলেন।
সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও, তাঁর হাতে থাকা নির্বাহী ও ভেটো ক্ষমতার কারণে তাঁকে কোনোভাবেই পুরোপুরি ক্ষমতাহীন বলা যায় না।
আগামী দুই বছর কংগ্রেসের সাথে দ্বন্দ্ব ও সমঝোতার এই জটিল পথে তিনি তাঁর রাজনৈতিক এজেন্ডা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারেন, সেটিই হবে তাঁর প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষা।