মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসের উভয় কক্ষ-উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাচ্ছে। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও চরম রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভাবনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি প্রদান করেছেন।
তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৃষ্ট উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ এবং তার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, মূলত সেটিই এই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ব্যাপক পরাজয়ের নেপথ্যে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর মার্কিন ভোটারদের একটি সুস্পষ্ট ও কঠোর গণরায় হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
বুধবার জনপ্রিয় মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নির্বাচনের ফলাফল এবং দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন।
এই সাক্ষাৎকারে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের চরম ভরাডুবির কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সরাসরি ইরানের সাথে সংঘাতের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বলেন, তার ব্যক্তিগত ধারণা অনুযায়ী ইরান যুদ্ধই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয়ের পেছনে একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি তার গৃহীত সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরে দৃঢ়তার সাথে মন্তব্য করেন যে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যা কিছু করেছেন, সাধারণ মানুষ তার অন্তর্নিহিত গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছে।
তার এই মন্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত প্রতীয়মান হয় যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি যে আপসহীন ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, সেটি কৌশলগত দিক থেকে সঠিক হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মাঠে তা দলের জন্য একটি বড় ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো যখন কোনো বড় ধরনের বৈদেশিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার একটি অনিবার্য ধাক্কা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে এসে আঘাত হানে। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে গোটা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ যেমন পাল্টে গিয়েছিল, তেমনি এর একটি ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সাক্ষাৎকারে পরোক্ষভাবে সেই বাস্তবতার কথাই স্বীকার করে নিয়েছেন।
তিনি মূলত দেশবাসীকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থেই তাকে এই যুদ্ধে জড়াতে হয়েছিল।
তার মতে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা এই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মাত্রাটি বুঝতে পারলেও, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়াগুলো মেনে নেওয়ার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতি একে অপরের সাথে কতটা নিবিড়ভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ তারই একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বীকার করেন যে, সাধারণ মার্কিন ভোটাররা সম্ভবত যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না।
বিশেষ করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বিশাল এবং গাড়িনির্ভর দেশে গ্যাসোলিন বা জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান নিয়ামক।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা এবং ইরানের সাথে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে মার্কিন ভোক্তাদের পকেটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, ব্যালট বাক্সে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে তারা মূলত সেই ক্ষোভেরই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ঘটনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়টুকুর জন্য এক অকল্পনীয় ও পাহাড়সম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো অনুযায়ী, আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট অনুমোদন এবং রাষ্ট্রপতির যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে কংগ্রেসের অনুমোদন একটি অপরিহার্য বিষয়।
যেহেতু সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ-উভয় জায়গাতেই ডেমোক্রেটিক পার্টি এখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে যাচ্ছে, সেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো নতুন আইন প্রণয়নের কর্মসূচি বা নীতিগত সিদ্ধান্ত পদে পদে চরম বাধার সম্মুখীন হবে।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এখন সহজেই প্রেসিডেন্টের যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারবেন, তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি তদন্ত শুরু করার ক্ষমতা পাবেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজেদের ভেটো প্রয়োগ করতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর ফলে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিতে পারে, যা ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত অনেক অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নকে কার্যত একটি অসম্ভব বিষয়ে পরিণত করবে।
এত বড় একটি রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পূর্ণ আস্থা বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাধারণত এই ধরনের বড় নির্বাচনী পরাজয়ের পর ক্ষমতাসীন সরকারগুলো তাদের নীতিগত দুর্বলতা ঢাকতে বা নতুন করে জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল বা পরিবর্তন এনে থাকে।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার মন্ত্রিসভায় কোনো ধরনের পরিবর্তন আনার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। তার এই অনড় অবস্থান প্রমাণ করে যে, তিনি তার প্রশাসনের বর্তমান নীতি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি এখনও সম্পূর্ণ আস্থাশীল।
তিনি হয়তো এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, নির্বাচনী পরাজয় মানেই তার সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি যা মূলত একটি আন্তর্জাতিক সংঘাতের অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থ এবং সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে যে একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব রয়েছে, এই নির্বাচনের ফলাফল তারই একটি ধ্রুপদী উদাহরণ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো দেশের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু মার্কিন ভোটাররা তাদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেই ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো অতি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুগুলো কীভাবে একটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে, এই নির্বাচন বিশ্ববাসীর সামনে সেই অমোঘ সত্যকেই নতুন করে উন্মোচিত করেছে।
আগামী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউস এবং ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষমতার এই নতুন ও বিপরীতমুখী সমীকরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, এখন পুরো বিশ্বের দৃষ্টি কেবল সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।