বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘সমর্থকরা ভোট দিলে বিপুল জয় আমাদেরই’, আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ এএম

‘সমর্থকরা ভোট দিলে বিপুল জয় আমাদেরই’, আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্প
ছবি : File Photo

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। দেশটির বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যেই দীর্ঘ ও উত্তেজনাপূর্ণ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং এখন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে চলছে ব্যালট গণনার কাজ।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক-সবার চোখ এখন চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে। ঠিক এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর ও চূড়ান্ত মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিজেদের সমর্থকদের উপস্থিতি ধরে রাখতে এবং নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের কাজ সম্পন্ন করার জন্য অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

তিনি তার দলের কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়েছেন যে, লাইন যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তাদের ভোট দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে তিনি এই যুক্তি ও গভীর আত্মবিশ্বাস উপস্থাপন করেছেন যে, রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকরা যদি তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে এই নির্বাচনে তাদের দলের বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করা সম্পূর্ণ নিশ্চিত।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের ঠিক আগে সোমবার রাতে জনপ্রিয় রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের বহুল আলোচিত ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

 

সেখানে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তার প্রশাসনের অর্জন এবং বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য বিজয়ের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করেন। ফক্স নিউজের প্রখ্যাত উপস্থাপক শন হ্যানিটির সাথে আলাপকালে ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দেন যে, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি ডেমোক্র্যাটরা কোনোভাবে জয়লাভ করে এবং মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ-হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস তথা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়, তবে তার প্রশাসনের বিগত বছরগুলোর সমস্ত কষ্টার্জিত সাফল্য মুহূর্তের মধ্যে মুছে যাবে।

 

তিনি দেশবাসীর সামনে একটি গভীর আশঙ্কার চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে তার সরকারের গৃহীত জনকল্যাণমূলক নীতিগুলো চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে তিনি দাবি করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে অর্থনৈতিক নীতিমালার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, তার প্রশাসন টিপস বা বকশিশের ওপর থেকে আয়কর প্রত্যাহার, ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজের মজুরির ওপর কর মওকুফ এবং বয়স্ক নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বা সোশ্যাল সিকিউরিটি বেনিফিটের ওপর থেকে করের বোঝা লাঘব করার মতো যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

ট্রাম্পের মতে, এই নীতিগুলো সাধারণ মার্কিনিদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদানে একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা যদি আগামীতে কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবে এই নীতিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

শন হ্যানিটির একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সাথে বলেন, তারা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য যা কিছু ইতিবাচক কাজ করেছেন, বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে তার সবকিছুই সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হবে।

 

তার এই বক্তব্য মূলত শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে একটি সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা, যাতে তারা তাদের অর্থনৈতিক সুবিধাদি রক্ষার স্বার্থেই রিপাবলিকানদের বাক্সে ভোট প্রদান করেন। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে এসেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচারণার কৌশল ততই আগ্রাসী ও আবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

জিওপি বা রিপাবলিকান পার্টির ভোটারদের প্রতি তার সর্বশেষ আবেদনে তিনি আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তিনি তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেন যে, তাদের অবশ্যই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ভোটকেন্দ্রে আসতে হবে।

 

এই নির্বাচনকে তিনি পরোক্ষভাবে নিজের প্রেসিডেন্সির ওপর একটি গণভোট হিসেবে দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন শুধু একটি কথাই ভাবেন যে, ব্যালট পেপারে স্বয়ং তার নাম রয়েছে।

 

ভোটাররা অন্য যা খুশি তা-ই করতে পারেন, কিন্তু তাদের ভোটটি অবশ্যই দিতে হবে। এর মাধ্যমে তিনি মূলত তার নিজের বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করার এক অভিনব ও সুকৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 

তিনি তার কট্টর সমর্থকদের এই জরুরি বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, কংগ্রেসের প্রার্থীরা জয়ী না হলে কার্যত তার নিজের নির্বাহী ক্ষমতাই ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির গতিপথ নির্ধারণে একটি অভাবনীয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশই নয়, বরং এটি তার প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক ও জাতীয় লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

ট্রাম্প মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, তার মেয়াদের বাকি সময়টাতে প্রশাসনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হলে ক্যাপিটল হিলে রিপাবলিকানদের আধিপত্য বজায় রাখা অপরিহার্য। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা এই নির্বাচনকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জনগণের রায় আদায়ের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে।

 

যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্টের দলের হাতছাড়া হয়, তবে ট্রাম্পকে পদে পদে আইনপ্রণেতাদের বাধার সম্মুখীন হতে হবে, যা তার সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং নতুন আইন প্রণয়নকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

 

এই চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের বারবার উচ্চারিত সতর্কবার্তা-তাদের লোকেরা ভোট দিলে বিপুল ভোটে জয়লাভ নিশ্চিত-বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা তথা কংগ্রেসের গঠনপ্রকৃতি ও ক্ষমতা বিভাজনের বিষয়টি এই নির্বাচনের মাত্রাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের নির্দিষ্ট সংখ্যক আসনের জন্য লড়াইয়ে প্রতিটি ভোটই অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসের হাতে আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন নির্বাহী সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত ক্ষমতা সংরক্ষিত থাকে।

 

তাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার প্রতিশ্রুত স্বপ্নের আমেরিকা গড়ার কাজ অব্যাহত রাখতে চান, তবে তাকে অবশ্যই কংগ্রেসের এই দুই কক্ষের অন্তত একটির, অথবা সম্ভব হলে উভয় কক্ষের নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে হবে।

 

ডেমোক্র্যাটরা যদি কোনোভাবে এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়, তবে তারা ট্রাম্পের যেকোনো বড় ধরনের আর্থিক সংস্কার বা নতুন নীতি বাস্তবায়নের পথে একটি দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে। ট্রাম্প তার ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে ঠিক এই ভয়ের ও আশঙ্কার জায়গাটিকেই সমগ্র দেশবাসীর সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

 

আধুনিক মার্কিন নির্বাচনের দীর্ঘ ইতিহাসে ভোটারদের উপস্থিতি বা ভোটাধিকার প্রয়োগের হার সবসময়ই জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এসেছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে, যেখানে সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ কিছুটা কম পরিলক্ষিত হয়, সেখানে কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টেনে আনা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বিশাল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই চ্যালেঞ্জটি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছেন। তার এই আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, রিপাবলিকান পার্টির নীতিগত অবস্থানে সাধারণ জনগণের বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে, কিন্তু সেই নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনকে ব্যালট বাক্সে রূপান্তরিত করাটাই এখন তাদের দলের সামনে একমাত্র ও প্রধান কাজ।

 

তিনি তার ভোটারদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সামান্যতম অলসতা বা ভোটদানে অনীহা গোটা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিত্র চিরতরে পাল্টে দিতে পারে, যার চরম মূল্য তাদের আগামী দিনে দিতে হতে পারে।

 

সব মিলিয়ে, ভোট গণনার এই শ্বাসরুদ্ধকর ও উত্তেজনাময় মুহূর্তে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের দৃষ্টিও এখন নিবদ্ধ রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আবেগপূর্ণ ও জোরালো শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক আহ্বান রিপাবলিকান ভোটারদের ঠিক কতটা আলোড়িত করতে পেরেছে, তা চূড়ান্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পরই পুরোপুরি পরিষ্কার হবে।

 

তবে তার এই বক্তব্য মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের ইতিহাসে একটি গভীর রেখাপাত করে থাকবে, যেখানে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট তার প্রশাসনের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও সাফল্য রক্ষার্থে সাধারণ ভোটারদের প্রতি এমন মরিয়া ও সংবেদনশীল আবেদন জানিয়েছেন।

 

এখন কেবলই অপেক্ষার পালা, মার্কিন জনগণ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তায় সাড়া দিয়ে রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা রাখেন, নাকি ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের চাবিকাঠি তুলে দিয়ে এক নতুন ও ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দেন।

 

- দ্য নিউইয়র্ক